© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

দফায় দফায় চুরি / ভেঙে পড়েছে পদ্মা সেতুর রেল সিগন্যাল ব্যবস্থা, ভয়াবহ দুর্ঘটনার শঙ্কা

শেয়ার করুন:
ভেঙে পড়েছে পদ্মা সেতুর রেল সিগন্যাল ব্যবস্থা,  ভয়াবহ দুর্ঘটনার শঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১২:০৪ পিএম | ০৫ এপ্রিল, ২০২৬
ভেঙে পড়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক সিগন্যাল সামগ্রী চুরি হয়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল এখন পুরানো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে ট্রেনের গতি কমেছে এবং রেলকর্মীরা যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শঙ্কায় রয়েছেন। তাই চুরি রোধ করা না গেলে সার্বিক রেল ব্যবস্থার নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

পদ্মাসেতু রেল সংযোগ রুটে ব্রিটিশ আমলের রেল পরিচালন পদ্ধতির ছাপ এখনও রয়ে গেছে। শত বছরের পুরানো সেই পদ্ধতি যেন পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ট্রেন দ্রুতগতিতে চলে, আর চালককে জরুরি বার্তা দিতে পয়েন্টসম্যানকে সবুজ পতাকা নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়। হাতে লোহার রিংয়ে বেঁধে দেয়া হচ্ছে সেই বার্তা। পয়েন্টসম্যানরা জানান, মালামাল চুরি হয়ে যাওয়ায় রোদ, বৃষ্টি বা ঝড়ের মধ্যেও এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
 
যদিও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে দেশের সর্বাধুনিক সিগন্যাল সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে, তবে নিমতলা স্টেশন মাস্টারের কক্ষে দেখা গেছে, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ইন্টারলক সিস্টেম পুরোপুরি বিকল। ট্রেনের খবর নিতে হচ্ছে মোবাইল ফোনে, আর চালকের কাছে দেয়া হচ্ছে হাতে লেখা নির্দেশিকা।
 
 
মুন্সিগঞ্জের নিমতলা স্টেশনের মাস্টার গয়েশ্বর মল্লিক বলেন, ‘সিগন্যালের সব যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে, ফলে আমাদের কোনো সিগন্যাল নেই। এখন এক লাইনে একটিমাত্র গাড়ি চলতে পারে, কোনো ক্রসিং সম্ভব হচ্ছে না।’
 
এই রুটে রেললাইনের পাশে স্থাপন করা সব সিগন্যাল বক্স চুরি হয়ে গেছে। এমনকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন চলাচলের তথ্য রেলকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার যন্ত্রপাতিও উধাও। এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনের সংযোগ ক্যাবল, সংকেত আদান-প্রদানের রিলে সিস্টেমও উধাও। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রায় ১৩-১৪টি সিগন্যাল ভেঙে চুরি করা হয়েছে। বর্তমানে কোনো সিগন্যাল কাজ করছে না; তাই ট্রেনগুলোকে হোম থেকে আউটার পর্যন্ত লটিং করে নিয়ে আসতে হচ্ছে।
 
ফলে সিগন্যাল সংশ্লিষ্টদের একমাত্র ভরসা এখন মোবাইল। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচলের পথ নির্ধারণ করছেন পয়েন্টসম্যান। এতে ট্রেনের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে ট্রেন চালকদের জন্য।
 
ট্রেনের চালকরা জানান, ছাড়তে সময় বেশি লাগে; লোপলাইন বাড়াতে সময় লাগে। ম্যানুয়ালি পয়েন্ট সেট করতে গিয়ে ভুলভ্রান্তির আশঙ্কা বেশি, আর যদি সিবিআই (সিগন্যাল বিফল) হয়, তখন পয়েন্ট ঠিকভাবে রং হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না।
 
রেল কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, চুরি রোধ করা না গেলে অচিরেই সার্বিক রেল ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি হবে। ঢাকা বিভাগ রেলওয়ের সিগন্যাল রক্ষণাবেক্ষণকারী মো. ইমরান হোসেন বলেন, সাংকেতিক ব্যবস্থাপনা এরমধ্যেই ভেঙে পড়েছে। যদি চুরি রোধ না করা যায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে ভবিষ্যতে এই জনগুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
 
রেল পুলিশের দাবি, সক্ষমতার অভাব ও সীমাবদ্ধতার কারণে তারা বরাবরই ব্যর্থ। ঢাকা বিভাগ রেলওয়ের পুলিশ সুপার নিকুলিন চাকমা বলেন, জনবল বেশি থাকলে বা লজিস্টিক সাপোর্ট আরও বেশি থাকলে ২৪ ঘণ্টা পেট্রোলিং দেয়া সম্ভব হত। এই চক্রের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শনাক্তের জন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে।
 
সারা দেশে তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথে ৪৭০টি স্টেশন ও অসংখ্য রেল স্থাপনা রয়েছে। অথচ রাষ্ট্রীয় এসব সম্পদের পাহারায় নিয়োজিত নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা মাত্র ৪ হাজার। রেলের মাঠকর্মীরা জানাচ্ছেন, নিরাপত্তাকর্মীদের উদাসীনতার কারণে প্রতিদিনই চুরি হচ্ছে মূল্যবান সিগন্যাল সামগ্রী। ফলে পুরো লাইনের সিগন্যাল ব্যবস্থা একেবারে বিকল হয়ে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সার্বিক রেল ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।

কেএন/টিকে

মন্তব্য করুন