পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মন্ত্রিসভা গঠনের দিনে কোথায় আছেন এবং কী করছেন মমতা?
ছবি: সংগৃহীত
০৩:২৪ পিএম | ০৯ মে, ২০২৬
শেষ কবে করকাতার হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের এই গলিটা এতটা শান্ত ছিল, তা হয়তো মনে করতে পারবেন না খোদ কালীঘাটের পুরনো বাসিন্দারাও। একটা দীর্ঘ সময় ধরে এই গলির প্রতিটি স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করত গোটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে। দিন হোক বা রাত, মন্ত্রীদের দামি গাড়ির সারি, পুলিশের সাইরেন, আর শত শত নেতা-কর্মীর ভিড়ে গিজগিজ করত যে চত্বর, আজ সেখানে এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা।
আজ পঁচিশে বৈশাখ। কলকাতার আকাশে সকাল থেকেই চড়া রোদ, আর বাতাসে এক অন্যরকম পরিবর্তনের গন্ধ। ঠিক যে মুহূর্তে কয়েক কিলোমিটার দূরে গঙ্গার ওপারে, ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে লক্ষ মানুষের উল্লাসের মধ্যে দিয়ে রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী, ঠিক সেই মুহূর্তে কালীঘাটের জীর্ণ টালির চালের সেই ঘরটিতে কেমন কাটছে বিদায়ী নেত্রীর সময়? জীবনের অন্যতম কঠিন পালাবদলের এই দিনে ঠিক কী করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
জানা গেছে, কালীঘাটের বাড়িতে নিভৃতেই রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৪ বছর যিনি এই রাজ্য শাসন করেছেন, আজ তার বাড়ির সামনে নেই সেই চিরচেনা 'সিজার্স ব্যারিকেড', নেই বাড়তি পুলিশি পাহারা। বদলে গেছে অনেক কিছু- নিঃশব্দে, দ্রুত।
ভোটের ফলাফলের পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রায় কোনো কথা বলেননি মমতা। সেই নীরবতা ভেঙে শনিবার এক্সে একটি পোস্ট দেন তিনি- রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে।
লেখেন, 'পঁচিশে বৈশাখের এই পুণ্য দিনে বিশ্ববন্দিত শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরণে নিবেদন করি আমার অন্তহীন প্রণাম। রবীন্দ্রজয়ন্তী আমাদের কাছে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরই এক নবজন্মের মহোৎসব। তাঁর সুগভীর জীবনদর্শন আমাদের প্রাত্যহিক পথচলার অবিনাশী আলোকবর্তিকা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন- বিভেদ নয়, মিলনই সত্য। উগ্র জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র মানবসভ্যতা যেন ঐক্যের মহামন্ত্রে দীক্ষিত হয়, এই শিক্ষাই তিনি বিশ্বচরাচরকে দিয়ে গেছেন।'
পোস্টে রবীন্দ্রনাথের পঙক্তিও তুলে ধরেন- 'হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।'
শনিবার (৯ মে) কালীঘাটের বাড়ির চত্বরেই রবীন্দ্রজয়ন্তীর আয়োজন করেছেন তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের নেতৃত্বস্থানীয় সদস্যদের ডাকা হয়েছে এই অনুষ্ঠানে।
উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। সাবেক মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এবং রাজ্যসভার সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় সঙ্গীত পরিবেশন করবেন। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর এটাই তৃণমূলনেত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি।
বড় কোনো আয়োজন নেই, তবে সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ। রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান হলেও এই কর্মসূচি থেকে মমতা দলকে কোনো রাজনৈতিক বা ভবিষ্যৎ কর্মসূচির বার্তা দেন কি না, সে দিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
এদিকে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে আরও অনেক কিছু। গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে রাজ্যে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে বিজেপি। ফলাফলের পরদিনই মমতার কালীঘাটের বাড়ির গলির মুখ থেকে দীর্ঘদিনের 'সিজার্স ব্যারিকেড' সরিয়ে নেয় পুলিশ। এতদিন প্রতিবেশীদেরও পরিচয়পত্র দেখিয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হতো- সেই কড়াকড়ি এখন পুরোপুরি উঠে গেছে।
লালবাজার জানিয়েছে, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশি পাহারা আর থাকবে না। তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়মানুযায়ী যতটুকু প্রটোকল ও নিরাপত্তা প্রাপ্য, তা দেওয়া হবে।
কলকাতা পুলিশের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আনফলো করা হয়েছে। নতুন করে ফলো করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও), কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট। বর্তমানে কলকাতা পুলিশের হ্যান্ডলটি মোট ৪২টি অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করছে।
৯ মে দুপুর পর্যন্ত মমতার নিজের এক্স হ্যান্ডল ও ফেসবুক পেজে তার পরিচয় 'পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী' হিসেবেই রয়ে গেছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ক্যামাক স্ট্রিটে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে থেকে সমস্ত পুলিশি প্রহরা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ব্যক্তিগত বাসভবন 'শান্তিনিকেতন' থেকেও মেটাল ডিটেক্টর ও স্ক্যানারসহ সব সরকারি সুরক্ষাসামগ্রী সরিয়ে নিয়েছে লালবাজার।
বিধানসভায়ও নতুন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন। একে একে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামফলক। সাবেক সরকারি মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষ, সাবেক ডেপুটি চিফ গভর্নমেন্ট হুইপ দেবাশিস কুমার এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর নামফলক স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে খুলে নেওয়া হয়েছে। প্রায় চার বছর তালাবন্ধ থাকা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘরটিও খোলা হয়েছে- নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তারের পর থেকে বন্ধ সেই ঘর পরিষ্কার করে নামফলক সরানো হয়েছে। সেখানে এবার বসবেন নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ের কর্মীরা। সোমবার থেকে বিধানসভায় নির্দিষ্ট ঘরে বসবেন শুভেন্দু অধিকারী নিজেও।
এসকে/টিএ