© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ওয়াশিংটনের ‘কঠোর ৫ দফা’ প্রত্যাখ্যান করল তেহরান

শেয়ার করুন:
ওয়াশিংটনের ‘কঠোর ৫ দফা’ প্রত্যাখ্যান করল তেহরান

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:৩০ এএম | ১৮ মে, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও নৌ অবরোধের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের চরম ও অনমনীয় জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন তেহরানকে সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থনৈতিক বা সামরিক ছাড় দিতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানিয়েছে।


ইরানের একাধিক শীর্ষ সংবাদ সংস্থার বরাতে রোববার (১৭ মে) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই খবর নিশ্চিত করেছে।


একদিকে কূটনৈতিক অচলাবস্থা, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে দ্রুত চুক্তিতে না এলে ইরানকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ যে হুমকি দেওয়া হয়েছে—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক সর্বাত্মক যুদ্ধের খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। এই তীব্র উত্তেজনার মাঝেই রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত ‘বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে’ একটি রহস্যময় ড্রোন হামলা হয়েছে, যা একটি জেনারেটরে আগুন ধরিয়ে দিলেও কোনো তেজস্ক্রিয়তা বা হতাহতের ঘটনা ঘটায়নি।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরান সংকট নিয়ে জরুরি টেলিফোন আলাপ করেছেন। একই দিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ফোনালাপে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার রণকৌশল এবং তার সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে অত্যন্ত কঠিন শর্তে ‘পাঁচ দফা’র একটি নতুন তালিকা হস্তান্তর করেছে। মার্কিন এই তালিকায় বলা হয়েছে, ইরান তাদের পুরো ভূখণ্ডে কেবল একটিমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে পারবে এবং তাদের উৎপাদিত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ সব ইউরেনিয়াম অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্থানান্তর করতে হবে।

এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে জব্দ থাকা ইরানের শত বিলিয়ন ডলার সম্পদের অন্তত ২৫ শতাংশ ছেড়ে দেওয়ার যে মানবিক দাবি তেহরান করেছিল, তাও সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

এমনকি যুদ্ধে ইরানের হওয়া বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কোনো ক্ষতিপূরণ দিতেও অস্বীকার করেছে তারা। ওয়াশিংটন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরান শর্ত মেনে সরাসরি আলোচনা শুরু করলেই কেবল সব ফ্রন্টে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।

মার্কিন এই অনমনীয় অবস্থান নিয়ে ইরানের অপর সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র রণক্ষেত্রে বা যুদ্ধের ময়দানে যা অর্জন করতে পারেনি, তা কোনো দৃশ্যমান ছাড় না দিয়েই আলোচনার টেবিলে গায়ের জোরে আদায় করতে চায়। তবে এই পাঁচ দফা নিয়ে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

স্থায়ী শান্তির জন্য ইরানও তাদের নিজেদের প্রস্তাবে কতগুলো অনড় অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তেহরানের প্রধান দাবি হলো- লেবাননে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্রন্টে অবিলম্বে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর জারি করা অবৈধ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কোনো হামলা চালানো হবে না এ মর্মে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর কাছ থেকে তারা লিখিত ও দৃঢ় আইনি প্রতিশ্রুতি চায়। এর পাশাপাশি বিদেশে জব্দ থাকা সব ইরানি সম্পদ মুক্তি এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা একযোগে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তারা।

ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’র পূর্ণ সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতেই থাকবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কার্যত বন্ধ থাকা এই কৌশলগত রুট দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য ইরান সম্পূর্ণ নতুন বিধিবিধান তৈরি করেছে, যার মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ‘টোল আদায়ের’ মতো বিতর্কিত নিয়মও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই টোল ব্যবস্থা নিয়ে ইরান ইতিমধ্যেই ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গোপনে আলোচনা শুরু করেছে। তবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানের এমন একচেটিয়া আধিপত্য ও টোল আদায়ের অবস্থানের ঘোর বিরোধী মার্কিন প্রশাসন।

চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে ১৪ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে ইরান সেই প্রস্তাবের যে জবাব দেয়, তাকে চরম অসন্তোষের সাথে ‘স্টুপিড’ (নির্বোধের মতো) বলে আখ্যা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি বর্তমানে কার্যত ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। এরপর থেকেই ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প হুমকি দিচ্ছেন যে, ইরানের সময় ফুরিয়ে আসছে এবং দ্রুত চুক্তি না করলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। ট্রাম্পের এই ক্রমাগত যুদ্ধের হুমকির জবাবে তীব্র পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুলফজল শেকারচি। রোববার এক সামরিক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টের জানা উচিত, ইরানি ভূখণ্ডে আবার কোনো হামলা চালানো হলে তাঁর নিজের দেশের বৈশ্বিক সম্পদ এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনী নজিরবিহীন ও ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।’

মার্কিন ও ইরানিদের এই মুখোমুখি যুদ্ধংদেহী অবস্থানের মধ্যেও শান্তি আলোচনা টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক ও অলৌকিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান। যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতাতেই দুই পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। এরপর ইসলামাবাদে ২০ ঘণ্টার দীর্ঘ ম্যারাথন বৈঠক ব্যর্থ হলেও পাকিস্তান হাল ছাড়েনি। শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সরাসরি আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী শান্তি এনে দিতে পারে।

পাকিস্তান এই অঞ্চলের সব পক্ষের গভীর আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।’ এই শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নকভি দুই দিনের জরুরি সফরে তেহরানে অবস্থান করছেন। রোববার তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে প্রায় ৯০ মিনিটের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন, যেখানে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানে হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে পর্দার আড়াল থেকে সমর্থন দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ছড়ানো। তবে পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক দায়িত্বশীলতার কারণে সেই কুৎসিত পরিকল্পনা সফলভাবে ব্যর্থ হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

এসকে/টিএ

মন্তব্য করুন