সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দ্বিমুখী নীতি শুভেন্দুর
ছবি: সংগৃহীত
১১:২২ পিএম | ২০ মে, ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিকব সীমান্তের দ্বিমুখী সুরক্ষার নীতির প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এই নীতির আওতায় সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে ২৭ কিলোমিটার জমি হস্তান্তর এবং অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকানোর পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারীদের আরও ব্যাপক পরিসরে ‘শনাক্ত, বাদ দেওয়া ও বহিষ্কার’ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন শুরু করেছেন তিনি।
বুধবার রাজ্য সচিবালয় নবান্নে বিএসএফ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, প্রথম পর্যায়ের এই ২৭ কিলোমিটার জমি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হবে। জোর দিয়ে তিনি বলেছেন, এটি সীমান্ত সুরক্ষার বৃহত্তর রূপরেখা এবং সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের কেবল শুরু মাত্র।
একই অনুষ্ঠানে রাজ্য পুলিশের মাধ্যমে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ সরাসরি বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের একটি নতুন ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের এই মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) আওতাভুক্ত নয়—এমন গোষ্ঠীর লোকদের গ্রেপ্তার ও অবিলম্বে কার্যকর হতে যাওয়া প্রক্রিয়ার অধীনে তাদের বহিষ্কার করা হবে।
ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী এই প্রক্রিয়াকে অনুপ্রবেশকারীদের ‘চিহ্নিতকরণ, বাদ দেওয়া ও বহিষ্কার’ করার সুনির্দিষ্ট কাঠামো হিসেবে অভিহিত করেছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জোড়া ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম দিকের অন্যতম নীতিগত বড় হস্তক্ষেপ। এর মাধ্যমে সীমান্ত সুরক্ষা ও অনুপ্রবেশ—দুটি বিষয়কে একসঙ্গে সামনে আনা হলো; যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় দলটির রাজনৈতিক প্রচারণার মূল কেন্দ্রে ছিল।
শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, শুরু হিসেবে বিএসএফকে ২৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জমি দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশপ্রেমিক নাগরিক এবং দক্ষ কর্মকর্তারা আগামী দিনগুলোতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন এবং সব ধরনের সহযোগিতা বাড়াবেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রিসভা এই জমি হস্তান্তরের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে এবং প্রধান সচিব এবং ভূমি ও ভূমি সংস্কার সচিবকে ৪৫ দিনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে পূর্বের ভুল সংশোধন হিসেবে উল্লেখ করে শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, আগের সরকার ‘তোষণ রাজনীতি’ এবং ভোট ব্যাংকের হিসাব-নিকাশের কারণে বিএসএফের চাওয়া জমি আটকে রেখেছিল। ভারত-বাংলাদেশ দীর্ঘ ও অরক্ষিত সীমান্তের কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক থাকার কারণে রাজ্য অরক্ষিত হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারে ইতোমধ্যে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়াবিহীন উন্মুক্ত অবস্থায় রয়ে গেছে।
তার অভিযোগ, এই বেড়াবিহীন অংশের মধ্যে প্রায় ৫৫৫ কিলোমিটারের জমি আগেই হস্তান্তর করা যেত। কিন্তু রাজনৈতিক কারণ এবং আগের সরকারের তোষণ রাজনীতির কারণে তা করা হয়নি। তিনি বলেন, কাঁটাতারের বেড়া এবং সীমান্ত সুরক্ষার জন্য যেখানেই জমির প্রয়োজন হবে, আমরা তা বিএসএফের হাতে তুলে দেব।
পশ্চিমবঙ্গের এই মুখ্যমন্ত্রী অনুপ্রবেশকে কেবল একটি সীমান্ত সমস্যা হিসেবেই নয়, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা, লাভ জিহাদ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং নারীদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী।
অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলার জন্য আরও কঠোর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ঘোষণাও দেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে গত বছরের ১৪ মে কেন্দ্র থেকে রাজ্যে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আগের সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান বা আইনটি কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়। আমরা এখন এটি অবিলম্বে কার্যকর করছি।
তিনি বলেন, একদিকে আগের সরকার সিএএর বিরোধিতা করেছিল এবং এই আইনটি কার্যকর করেনি বা এই সুযোগটি ব্যবহার করেনি। আমরা এখন থেকে এটি বাস্তবায়ন করছি।
নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের বিধানগুলোর কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই আইনের আওতায় থাকা সাতটি সম্প্রদায়ের মানুষ—যারা নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন—তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, সিএএর অধীনে সাতটি সম্প্রদায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং যারা ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসেছেন তারা সুরক্ষিত থাকবেন; পুলিশ তাদের আটক করতে পারবে না।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, যারা সিএএর আওতাভুক্ত নন, তাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে। রাজ্য পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। বিএসএফ তখন বাংলাদেশের সীমান্ত কর্তৃপক্ষ বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে তিনি জানান।
শুভেন্দু বলেন, বিএসএফ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ইতোমধ্যে এই নির্দেশনা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইউটি/টিএ