ব্রিটেনে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ বনাম হবিগঞ্জের শংকরপাশায় ব্রিটিশ প্রশাসনের ব্যবস্থা
ছবি: সংগৃহীত
০৬:১৮ পিএম | ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
হবিগঞ্জের শংকরপাশা মসজিদকে ঘিরে ১৯২৮–২৯ সালের সরকারি নথিগুলো পড়লে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন সামনে আসে—ব্রিটিশরা নিজেদের দেশে প্রাচীন স্থাপনা ও প্রত্নসম্পদ কীভাবে সংরক্ষণ করত, আর একই সময়ে উপনিবেশিক বাংলায় তারা কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল?
প্রথমেই মনে রাখা দরকার, ব্রিটেনে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের আইনগত কাঠামো ১৯২৮ সালের অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল। ইংল্যান্ডে Ancient Monuments Protection Act 1882 ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর একটি। তবে তখন এর পরিধি ছিল সীমিত এবং মূলত প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ১৯০০ সালের আইনে রোমান ও মধ্যযুগীয় স্থাপনাগুলোকেও ধীরে ধীরে সুরক্ষার আওতায় আনা হয়।
এরপর আসে ১৯১৩ সালের Ancient Monuments Consolidation and Amendment Act। এই আইন ব্রিটেনে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন আনে। সংরক্ষণ শুধু সরকারি মালিকানাধীন স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপনাকেও আইনি সুরক্ষার আওতায় আনার ব্যবস্থা তৈরি করে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, monument-এর জাতীয় গুরুত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনে সংরক্ষণমূলক নির্দেশ দেওয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।
অর্থাৎ ১৯২৮ সালে, যখন শংকরপাশার মানুষ তাঁদের মসজিদ রক্ষার জন্য আবেদন করছেন, তখন ব্রিটেনে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের একটি তুলনামূলকভাবে বিকশিত আইনি কাঠামো ইতোমধ্যে বিদ্যমান ছিল।
শংকরপাশায়ও দেখা গেল একই ধরনের একটি প্রক্রিয়া
শংকরপাশা মসজিদের ১৯২৮ সালের নথিতে দেখা যায়, স্থানীয় মানুষের আবেদন সরাসরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়নি। প্রথমে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন পরীক্ষা করেছে। সিলেটের ডেপুটি কমিশনার জে. এ. ডসন আবেদনটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতামত নেওয়ার সুপারিশ করেন।
এরপর বিষয়টি সুরমা উপত্যকা ও পার্বত্য বিভাগের কমিশনারের মাধ্যমে আসাম সরকারের কাছে যায়। পরবর্তীতে Archaeological Survey of India-এর কর্মকর্তারাও মসজিদটি পরিদর্শন ও মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত হন।
এই ধারাবাহিকতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
স্থানীয় জনগণের আবেদন → প্রশাসনিক যাচাই → প্রত্নতাত্ত্বিক মতামত → সরেজমিন পরিদর্শন → সরকারি সিদ্ধান্ত।
অর্থাৎ শংকরপাশার ক্ষেত্রে সংরক্ষণকে শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; এর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

১৯২৯ সালে আইনি স্বীকৃতি
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল আসে ১৯২৯ সালে। সরকারি নোটিফিকেশনের মাধ্যমে শংকরপাশার মসজিদকে Ancient Monuments Preservation Act, 1904-এর অধীনে protected monument হিসেবে ঘোষণার ব্যবস্থা করা হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। ব্রিটেনে ১৯১৩ সালের আইনের মাধ্যমে যে ধরনের statutory protection বা আইনগত সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছিল, উপনিবেশিক বাংলাতেও ১৯০৪ সালের ভারতীয় আইনের অধীনে অনুরূপ একটি প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছিল।
তবে দুই ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি এক-একটি সমতা টানা ঠিক হবে না। ব্রিটেনে আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সঙ্গে নিজেদের দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রত্নস্থানের প্রয়োজন অনুযায়ী বিকশিত হয়েছিল; অন্যদিকে ভারতে ১৯০৪ সালের আইন ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসনের অধীন একটি পৃথক আইনি কাঠামো। ফলে দুটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট এক ছিল না।
সংরক্ষণ মানে শুধু মেরামত নয়
শংকরপাশার নথিতে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।স্থানীয় মানুষ মসজিদটি সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় উপাসনার উপযোগী করে তোলা এবং একই সঙ্গে পুরোনো স্থাপনাটিকে রক্ষা করা। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কিছুটা ভিন্ন।
নথিতে দেখা যায়, মসজিদটির ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য যাতে সাধারণ সংস্কারের মাধ্যমে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতা ছিল। বিশেষ করে ইচ্ছেমতো whitewashing বা এমন ধরনের repair, যা স্থাপনার প্রত্নতাত্ত্বিক চরিত্র পরিবর্তন করতে পারে, তা নিয়ে আপত্তি ছিল। এই জায়গাটিই আধুনিক conservation-এর একটি মৌলিক ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।
একটি পুরোনো ভবনকে নতুন ভবনের মতো করে দেওয়া সংরক্ষণ নয়। বরং তার বয়স, নির্মাণশৈলী, পুরোনো উপাদান, স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহাসিক চিহ্ন যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনীয় মেরামত করাই প্রকৃত সংরক্ষণ।
ব্রিটেনেও ১৯১৩ সালের পর থেকে scheduled monuments রক্ষার ক্ষেত্রে স্থাপনার ঐতিহাসিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখার ধারণা ক্রমশ শক্তিশালী হয়। Historic England-এর বর্তমান ব্যাখ্যায়ও scheduled monument-কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একই বা আরও ভালো অবস্থায় হস্তান্তরের নীতির কথা বলা হয়েছে।
ব্রিটেনে রাষ্ট্রীয় অভিভাবকত্বের ধারণা
ব্রিটিশ সংরক্ষণ ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল guardianship বা রাষ্ট্রীয় অভিভাবকত্ব। ১৮৮২ সালের আইনের সময় থেকেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ monument সরকার নিজের তত্ত্বাবধানে নেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। পরে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়। ১৯১৩ সালের আইনের পর scheduled monument-এর ধারণা আরও শক্তিশালী হয় এবং প্রত্নস্থাপনাকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার আওতায় আনার ব্যবস্থা কার্যকর হয়।
শংকরপাশার আবেদনপত্রেও স্থানীয় মানুষ ঠিক একই ধরনের একটি দাবি করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, মসজিদটির নির্দিষ্ট মালিক বা অভিভাবক নেই; তাই সরকার যদি এর guardianship গ্রহণ করে, তাহলে মসজিদটির ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ, guardianship-এর ধারণাটি শুধু ব্রিটেনে ছিল না; ১৯২৮ সালের শংকরপাশার আবেদনকারীরাও এটিকে তাঁদের মসজিদ রক্ষার কার্যকর পথ হিসেবে দেখেছিলেন।
তবে পার্থক্যও ছিল
এখানে ব্রিটিশ শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যও দেখা যায়। ব্রিটেনে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ ছিল নিজেদের জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষার একটি ক্রমবর্ধমান রাষ্ট্রীয় প্রকল্প। ১৯১৩ সালের পর বিশেষজ্ঞ, প্রত্নতাত্ত্বিক, স্থাপত্যবিদ এবং সরকারি সংস্থার অংশগ্রহণে এই ব্যবস্থাটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক হয়। ১৯২১ সাল থেকে scheduled ancient monuments-এর তালিকাও প্রকাশিত হতে শুরু করে।
কিন্তু ভারতে একই ধরনের সংরক্ষণ ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কাঠামোর মধ্যে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ব্রিটিশরা যে heritage conservation-এর ধারণা নিজেদের দেশে গুরুত্বের সঙ্গে বিকশিত করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রেও কি তারা একই মাত্রার গুরুত্ব ও সম্পদ বরাদ্দ করেছিল?
শংকরপাশার নথি এই প্রশ্নের একটি সরল উত্তর দেয় না। বরং এটি একটি জটিল বাস্তবতা দেখায়। একদিকে স্থানীয় মানুষের আবেদনকে প্রশাসন গুরুত্ব দিয়েছে, প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করেছে, মসজিদ পরিদর্শনের ব্যবস্থা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে।
অন্যদিকে, একই নথিতে দেখা যায় সরকারি অর্থ ব্যয়, মেরামত ও guardianship নিয়ে নানা শর্ত ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ছিল।
অর্থাৎ আইন ছিল, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও ছিল; কিন্তু আইন থাকলেই যে ঐতিহ্য দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত হবে, তার নিশ্চয়তা ছিল না।
সবচেয়ে বড় মিল—ঐতিহ্যকে ‘পুরোনো ভবন’ হিসেবে নয়, ইতিহাসের দলিল হিসেবে দেখা
শংকরপাশা মসজিদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—১৯২৮ সালের আবেদনকারীরা নিজেরাই মসজিদটির ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও শিল্পমূল্যের কথা বলেছিলেন। তাঁরা মসজিদের শিলালিপি পাঠোদ্ধারের জন্য বিশেষজ্ঞ চেয়েছিলেন। প্রশাসনও সেই দাবিকে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
এখানে আধুনিক heritage conservation-এর একটি মৌলিক ধারণার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
একটি পুরোনো স্থাপনা কেবল তার দেয়াল, গম্বুজ বা ইট-পাথরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত লিপি, স্থাপত্য, নির্মাণপ্রযুক্তি, ব্যবহার, সামাজিক স্মৃতি, ঐতিহাসিক ঘটনা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ—সবকিছু মিলে তার heritage value তৈরি করে।
আজকের ব্রিটিশ heritage system-এও archaeological ও historic interest নির্ধারণের সময় কোনো স্থানের অতীত মানবজীবন, ঐতিহাসিক ঘটনা, স্থাপত্য ও সামাজিক-ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিবেচনা করা হয়।
১৯২৯ সালের শংকরপাশা আমাদের কী শেখায়?
প্রায় একশ বছর আগে শংকরপাশার মানুষ যে দাবি তুলেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁরা বলেননি—পুরোনো মসজিদটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। তাঁরা চেয়েছিলেন—পুরোনোটিকে রক্ষা করতে হবে, সরকার দায়িত্ব নিক, বিশেষজ্ঞরা শিলালিপি পড়ুন ও মসজিদ ও দিঘির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকৃতি পাক।
আর ব্রিটিশ প্রশাসনের নথি দেখায়, সেই দাবিকে শেষ পর্যন্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
এখানেই শংকরপাশা মসজিদের ইতিহাস আজকের বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা হয়ে ওঠে।
প্রায় একশ বছর আগে একটি গ্রাম তার অতীতকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করেছিল। রাষ্ট্র সেই আবেদনকে প্রশাসনিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়েছিল। এখন প্রায় একশ বছর পর আমাদের প্রশ্ন—আমরা সেই ঐতিহ্যকে কতটা রক্ষা করতে পেরেছি?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই— ঐতিহ্য একবার হারিয়ে গেলে তার কপি তৈরি করা যায়, কিন্তু তার আসল ইতিহাস ফিরিয়ে আনা যায় না।
লেখক: শাহাবুদ্দিন শুভ
প্রধান সম্পাদক, সিলেটপিডিয়া
কেএন/টিএ