ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা বাতিল না করলে রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা
১১:২৫ পিএম | ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ও তরুণ সমাজ। তারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রস্তাবিত এই ইজারা চুক্তি বাস্তবায়ন হলে একদিকে দেশের বিপুল রাজস্ব আয় কমবে, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির’ রিসার্চ উইং আয়োজিত “ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা চেষ্টা: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য ও দাবি তুলে ধরা হয়।
সংগঠনের আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় বৈঠকে মূল গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সদস্য সচিব শাহাদাত ফরাজী সাকিব।
গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে সম্পূর্ণ দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এনসিটি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর প্রতি বছর প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন ডলার নিট আয় করে। অথচ ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত ইজারা মডেলে প্রশাসনিক ব্যয় বাদ দিলে নিট আয় দাঁড়িয়ে যাবে প্রায় ৫৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে। এর ফলে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৯২ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারাবে। এছাড়া, দেশীয় অপারেটররা যেখানে বর্তমানে বছরে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ (TEU) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে, সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আগামী চার বছর পরের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টিইইউ।
গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক সহকারী প্রধান ও বিইউপির সাবেক প্রো-ভিসি কমোডর জসীমউদ্দীন বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে ঔপনিবেশিক শোষণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দেশের কৌশলগত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব নতুন করে হুমকির মুখে পড়তে পারে।”
জনতার দলের মুখপাত্র মেজর (অব.) ডেল এইচ খান বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তির মডেলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি টিইইউ কনটেইনার থেকে অর্জিত মুনাফা মার্জিন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বাধীন ‘ভ্যালু ফর মানি’ (Value for Money) মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি বন্দর নিরাপত্তা, কাস্টমস ও ভূমির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে রাখার জোর দাবি জানান তিনি।
দৈনিক ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক ও পার্বত্য নিউজের সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ দেশের ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কথা তুলে ধরে বলেন, “যুদ্ধ কিংবা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিদেশি অপারেটর ব্যবসায়িক স্বার্থে কার্যক্রম সীমিত করলে পুরো দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ধসে পড়তে পারে। তাই রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা ও বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত রাখা জরুরি।”
স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির মুখপাত্র মুহিউদ্দিন রাহাত অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত এবং অত্যন্ত লাভজনক একটি টার্মিনাল পরিচালনা বিদেশি কোনো গোষ্ঠীর হাতে সোপর্দ করার আগে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বৈঠকে অংশ নেওয়া গবেষক, আইনজীবী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, বিভিন্ন দেশে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ও বন্দর পরিচালনার রেকর্ড বিবেচনা করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। আলোচনা থেকে অবিলম্বে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিল করে লাভজনক এই রাষ্ট্রীয় টার্মিনাল দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালনা এবং যেকোনো চুক্তির অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্যায়ন জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
এমআর/টিএ