© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক: কী আলোচনা হবে, কারা থাকছেন

শেয়ার করুন:
পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক: কী আলোচনা হবে, কারা থাকছেন

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১২:৩৩ পিএম | ১০ এপ্রিল, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ছয় সপ্তাহ পর এবার কূটনৈতিক মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই দেশ। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বহুল আলোচিত বৈঠককে ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তার মিশ্র পরিবেশ। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা, লেবানন ইস্যুতে মতপার্থক্য এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস। আর এসব কিছুর মাঝে এই আলোচনা কতদূর এগোবে, সেটার দিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সমন্বিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ইরানের পাল্টা হামলায় সংঘাতে আরও বহু দেশ জড়িয়ে পড়ে এবং হাজারও মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আর তার ঠিক ছয় সপ্তাহ পর সেই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদে বসতে যাচ্ছে উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠক।

এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে। এরই মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। তবে যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং লেবাননে ইসরায়েলের বাড়তি হামলার কারণে এই সমঝোতা ইতোমধ্যে চাপে পড়ে গেছে।

যুদ্ধ চলাকালে ইরান ইসরায়েল ছাড়াও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। আর এসব হামলা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রপ্তানির কেন্দ্রকে অস্থিতিশীল করে তোলে। একই সঙ্গে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং শুধু ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করা দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। এতে বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয় এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়ে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদের মারগালা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সবুজে ঘেরা রাজধানীতে জড়ো হচ্ছেন এই সংঘাতে জড়িত প্রধান পক্ষগুলোর প্রতিনিধিরা। এই আলোচনায় কারা অংশ নিচ্ছেন, কোথায় বসছে বৈঠক, কী কী বিষয় আলোচনায় আসবে এবং কী ধরনের বাধা সামনে রয়েছে- সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

বৈঠক কবে ও কোথায় হবে?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দুই পক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার আমন্ত্রণ জানানোর পর এই সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, স্থানীয় সময় শনিবার সকালে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গত ৮ এপ্রিল জানিয়েছে, আলোচনা সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিনিধি দলের কিছু সদস্য শনিবারের পরও ইসলামাবাদে অবস্থান করতে পারেন বা পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য আবার ফিরে আসতে পারেন।

পাকিস্তানের রাজধানীর রেড জোন এলাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশে অবস্থিত সেরেনা হোটেলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার সন্ধ্যা থেকে রোববার পর্যন্ত হোটেলটি পুরোপুরি খালি করে বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

এছাড়া ফেডারেল রাজধানীতে ৯ ও ১০ এপ্রিল সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যদিও পুলিশ, হাসপাতাল ও জরুরি সেবাগুলো এর বাইরে থাকবে। শহরজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রেড জোন সিল করে দেয়া হয়েছে এবং ইসলামাবাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে।

বৈঠকে কারা অংশ নিচ্ছেন?
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার।

ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কোনও প্রতিনিধি থাকবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। কালিবাফ নিজেও আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার।

তবে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিনিধি দলগুলো বাস্তবে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়।

পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোঘাদ্দাম এক পর্যায়ে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন যে ইরানি প্রতিনিধি দল ৯ এপ্রিল পৌঁছাবে। তিনি জানান, ইসরায়েলের বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কারণে ইরানি জনমতের সংশয় থাকলেও ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ করতে তারা আসছেন। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পোস্টটি মুছে দেন।

আলোচনা কীভাবে হবে?
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আলোচনার আনুষ্ঠানিক স্বাগতিক হিসেবে শুক্রবার বা শনিবার সকালে দুই পক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করতে পারেন। উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আলোচনার মধ্যস্থতায় থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আলোচনায় অংশ নেবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে বসবেন এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বার্তা আদান-প্রদান করবেন।

এই আলোচনায় ভ্যান্সের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান উইটকফ ও কুশনারের ওপর আস্থা রাখতে অনাগ্রহী, কারণ গত ফেব্রুয়ারিতে মাস্কাট ও জেনেভায় আলোচনার সময়ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। তাদের কাছে ভ্যান্স তুলনামূলকভাবে সমঝোতার পক্ষে বেশি উন্মুক্ত।

২০২৮ সালের সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্স মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

বৈঠককে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে বহু সংখ্যক ভিসা আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২০ জন সাংবাদিক ইতোমধ্যেই অনুমোদন পেয়েছেন। একই সঙ্গে ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন নিরাপত্তা দল ইতোমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন।

পাকিস্তানে আলোচনা কেন?
সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে পাকিস্তান। অতীতে দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও বর্তমানে ইসলামাবাদের সঙ্গে উভয়ের কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে।

পাকিস্তানি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে এবং দেশটিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠী বসবাস করে। যার তেহরানের কাছেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি নেই। আর এটিও ইরানের কাছে ইসলামাবাদকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। একই সঙ্গে ২০০৪ সাল থেকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা পেয়েছে।

তবে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের পদ প্রায়ই খালি থাকে। ২০১৮ সালের পর থেকে কেবল ডোনাল্ড ব্লোম ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে পদটি শূন্য। সবশেষ ২০০৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ পাকিস্তান সফর করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সর্বশেষ সফর করেন জো বাইডেন, ২০১১ সালে।

১৫ বছর পর ভ্যান্সের এই সফরটি বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বখোনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা হবে।

আলোচনায় কী কী বিষয় থাকবে?
দুই পক্ষই বড় ধরনের মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনায় বসছে। ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে রয়েছে- হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা বন্ধসহ নানা দাবি।

যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব মেনে নেয়নি, তবে ট্রাম্প এটিকে ‘আলোচনাযোগ্য ভিত্তি’ বলেছেন। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি, যা ওয়াশিংটনের কাছে অপরিহার্য শর্ত। তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এটি স্বীকার করেনি।

এছাড়া লেবানন ইস্যুও বড় বিরোধের কারণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের হামলায় গত বুধবারই ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ এই যুদ্ধে এটিই লেবাননে সবচেয়ে তীব্র হামলা।
আরাগচি সতর্ক করেছেন, ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে ইরান যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিতে হবে- যুদ্ধবিরতি, নাকি ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা। অন্যদিকে ভ্যান্স, ট্রাম্প ও হোয়াইট হাউস বলছে- এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন নেই।

বিশ্লেষক মাসুদ খালিদ বলেন, আলোচনার আগেই পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে গেছে। তার মতে, ‘ইসরায়েল পুরো প্রক্রিয়াটি ভেস্তে দিতে চায়’। বিশ্লেষক সাহার খান বলেন, সবচেয়ে বড় বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস।

সম্ভাব্য ফলাফল ও বাধা কী?
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে চূড়ান্ত সমঝোতার সম্ভাবনা কম। ইরানের রাষ্ট্রদূত ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলের হামলা আলোচনা ভণ্ডুল করার চেষ্টা। লেবাননই এখন প্রধান দ্বন্দ্বের কেন্দ্র। খালিদের মতে, ‘সমঝোতা সম্ভব, তবে তা জটিল ও দীর্ঘায়িত হতে পারে।’

বিশ্লেষক ডানিয়া থাফার বলেন, আলোচনায় ইসরায়েলের অনুপস্থিতি বড় কাঠামোগত সমস্যা। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের প্রধান পক্ষ হয়েও ইসরায়েল আলোচনায় নেই- এটি বড় দুর্বলতা’।
অন্যদিকে খালিদ মনে করেন, সময়ের সঙ্গে দুই পক্ষের অবস্থান নরম হতে পারে। তার মতে, পারমাণবিক ইস্যুতে আংশিক সমঝোতা এবং হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে বহুপাক্ষিক সমাধান সম্ভব। তবে শান্তির গ্যারান্টি দেয়ার মতো কোনও দেশ এগিয়ে আসবে না বলেও তিনি মনে করেন।

অপরদিকে সাহার খান বলেন, আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা তৈরি করা। তার মতে, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে, সেটাই বড় অগ্রগতি হবে।’

কেএন/এসএন

মন্তব্য করুন