© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

যে আর্জেন্টাইন ব্রাজিলে গিয়ে শিখিয়েছিলেন, ফুটবল কীভাবে খেলতে হয়

শেয়ার করুন:
যে আর্জেন্টাইন ব্রাজিলে গিয়ে শিখিয়েছিলেন, ফুটবল কীভাবে খেলতে হয়

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:৪১ পিএম | ২৯ মে, ২০২৬
‘এই মানুষটার ছবি তোলা উচিত, আমার না!’ ১৯৬৫ সালে বুয়েন্স এইরেসের এজেইজা বিমানবন্দরে ফটোগ্রাফারদের উদ্দেশে এভাবেই চিৎকার করে বলেছিলেন পেলে। ব্রাজিলের ফুটবলসম্রাট তখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে, সংবাদপত্রের ক্যামেরাগুলো থাকে তার দিকেই তাক করা। আর তিনি যে ‘মানুষটির’ দিকে ইঙ্গিত করে ছবি তুলতে বলছিলেন, তিনি ছিলেন আন্তোনিও সাস্ত্রে, যিনি বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তে ক্লাবের একটি প্রতিনিধিদলের জন্য, যেখানে ছিলেন তার ছেলেও।

এই ঘটনার দুই বছর পর, বিখ্যাত কোচ ওসভালদো ব্রান্দাও; যিনি কোচিং জীবনে জিতেছিলেন ১৬টি, যার মধ্যে ছিল ১৯৬৭ সালে ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তের নাসিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপও, তিনি এল গ্রাফিকো পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টাইনরা আমাদের ব্রাজিলিয়ানদের অনুকরণ করতে চায়, কিন্তু তারা ভুলে যায় যে বিশ বছর আগে এক আর্জেন্টাইন ব্রাজিলে এসে আমাদের ফুটবল শিখিয়ে গিয়েছিল। তার নাম আন্তোনিও সাস্ত্রে।’

১৯১১ সালের ২৭ এপ্রিল বুয়েন্স এইরেসের লোমাস দে জামোরায় জন্ম নেওয়া সাস্ত্রে ১৯২৯ সালে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন প্রোগ্রেসিস্তা ক্লাবে। তখন ক্লাবটি নিম্ন বিভাগে খেলত। অবশ্য প্রায় ৯০ বছর ধরে ক্লাবটি আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সাঁতার, তায়কোয়ান্দো ও পেলোটা পালেতার মতো ক্রীড়া কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এক মৌসুমেই নিজেকে আলাদা করে তোলেন সাস্ত্রে। তিনি নজরে পড়েন মানুয়েল সিওয়ানের, যিনি নিজেও প্রোগ্রেসিস্তার যুব একাডেমির প্রোডাক্ট এবং তখন ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তের কিংবদন্তি গোলস্কোরার। তিনি সাস্ত্রেকে লানুসের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে ট্রায়ালের সুযোগ দেন। সাস্ত্রে পরে এল গ্রাফিকোকে বলেছিলেন, প্রথমে তিনি রিজার্ভ দলে খেলেছিলেন, কিন্তু একবার মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার পর আর কখনও বাদ পড়েননি। মজার বিষয় হলো, ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তে কখনও তার ট্রান্সফার ফি প্রোগ্রেসিস্তাকে দেয়নি।

ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তেতে তার ক্যারিয়ারই ব্যাখ্যা করে কেন তিনি আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে ৩৪১ ম্যাচ খেলে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসে অষ্টম সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় হন। আর ১১২ গোল করে আজও তিনি ক্লাবের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা।

ক্লাব অ্যাতলেটিকো ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তের প্রথম পেশাদার যুগের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিলেন তিনি। ভিসেন্তে দে লা মাতা এবং আরসেনিও এরিকোর সঙ্গে তার আক্রমণভাগ ছিল আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ত্রয়ীগুলোর একটি।

তবে শুধু আক্রমণভাগেই নয়, সাস্ত্রে ছিলেন অবিশ্বাস্যরকম বহুমুখী। সাধারণত তিনি বাঁ-দিকের ইনসাইড ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতেন, যা আজকের ভাষায় অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা সেকেন্ড স্ট্রাইকারের মতো। কিন্তু ক্যারিয়ারে মাঠের প্রায় সব পজিশনেই খেলেছেন তিনি। এমনকি দু’বার জরুরি পরিস্থিতিতে গোলকিপার হিসেবেও মাঠে নামেন, একবার সান লোরেঞ্জোর বিপক্ষে, আরেকবার পেনিয়ারোলের বিরুদ্ধে।

মাত্র ৩৪ ম্যাচই যথেষ্ট ছিল তাকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অন্যতম বড় নাম বানানোর জন্য। বিশেষ করে ১৯৩৭ সালের দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে তার পারফরম্যান্স কিংবদন্তি হয়ে আছে। ফাইনালে ব্রাজিলের বাঁ উইংয়ে খেলা ভয়ংকর টিম ও পাতেস্কোকে ঠেকাতে কোচ মানুয়েল সেওয়ানে তাকে রাইট-ব্যাক হিসেবে খেলান। সেই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা শিরোপা জেতে, আর চার বছর পরও সেই সাফল্য পুনরাবৃত্তি করে।

১২টি সফল মৌসুম কাটানোর পর, বয়স ত্রিশ পেরিয়ে যাওয়ায় ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তের কর্মকর্তারা তাকে খুব সামান্য অর্থের প্রস্তাব দেন। তখন ফুটবল ব্যবসায়ী কার্লোস দে লা বারগার প্রচেষ্টায় তিনি পাড়ি জমান ব্রাজিলে, যোগ দেন সাও পাওলোতে।

তখন সাও পাওলো ছিল করিন্থিয়ান্স ও পালমেইরাসের ছাঁয়ায় ঢাকা একটি ক্লাব, যারা নতুন তারকার খোঁজে ছিল। আর্জেন্টাইন ফুটবল ইতিহাসবিদ এস্তেবান বেকারম্যানের মতে, সাও পাওলোতে তার শুরুটা সহজ ছিল না। শুরু থেকেই তার সমস্যা হয়েছিল, কারণ তাকে অতিরিক্ত অনুশীলন করতে বলা হচ্ছিল। তবে মাঠের পারফরম্যান্সই দ্রুত সব সমস্যা মিটিয়ে দেয়।

তার ভাষায়, ‘তিনি বিশেষ প্রশিক্ষণসূচি চেয়েছিলেন, কারণ এত কঠিন অনুশীলনে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না। আর তার অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতার জন্য সেটার প্রয়োজনও ছিল না। ক্লাব সেটা মেনে নেয়।’

এরপরই শুরু হয় তার জাদু। ১৪ আগস্টের এক ম্যাচে অ্যাতলেটিকা পর্তুগেসার বিপক্ষে ৯-০ জয়ে একাই ছয় গোল করেন তিনি। সেই মৌসুমে সাও পাওলো ১২ বছর পর কাম্পেওনাতো পাউলিস্তা জেতে।

১৯৪৩ সালের সেই শিরোপার পর আরও দুটি রাজ্য শিরোপা আসে ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালে। সাস্ত্রে হয়ে ওঠেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ‘প্রথম বিদেশি আইডল’।

১৯৪৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর, কানায় কানায় পূর্ণ পাকাইম্বু স্টেডিয়ামে রিভারপ্লেটের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে সাও পাওলোর জার্সিতে বিদায় নেন তিনি। ম্যাচটি ২-১ গোলে জেতে রিভার।

দক্ষিণ আমেরিকাত কিংবদন্তি প্রচলিত আছে, এক তরুণ ফুটবলার, যে তখন সান্তোসে সবে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেছে, তাকে তার বাবা ডনদিনহো বলেছিলেন, ‘একদিন যদি তুমি আন্তোনিও সাস্ত্রের মতো খেলতে পারো, তাহলে আমি নিজেকে ভাগ্যের ছোঁয়া পাওয়া মানুষ মনে করব। অর্ধেকটাও পারলেই আমি সন্তুষ্ট।’
সেই তরুণটির নাম ছিল পেলে!

‘আন্তোনিও সাস্ত্রে ব্রাজিলিয়ানদের ফুটবল খেলতে শিখিয়েছিলেন,' অসভালদো ব্রান্দাওয়ের মতো করে বললে ব্যাপারটা হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত শোনায়। বরং বলা ভালো, তিনি তাদের ফুটবল ভাবনার ধরণটাই বদলে দিয়েছিলেন।

জোনাথন উইলসন তার বই ইনভার্টেড পিরামিডের র সপ্তম অধ্যায় ‘দ্য অর্গানাইজড কার্নিভাল’- তিনটি সাক্ষ্যের কথা তুলে ধরেছেন, যা ব্যাখ্যা করে সেই সময় ব্রাজিলে ফুটবল কীভাবে দেখা হতো এবং কেন খেলাটি সবচেয়ে বেশি শেকড় গেড়েছিল দরিদ্র পাড়াগুলোতে।

প্রথম সাক্ষ্যটি নৃবিজ্ঞানী রবার্তো দা মাত্তার। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ১৮৮৮ সালে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরও ব্রাজিলের আইনকানুন মূলত ধনী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করত। তিনি বলেন, ‘মানুষ শিখে গিয়েছিল নিজেদের ওপর নির্ভর করতে, বাইরের কাঠামোর ওপর নয়। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ঐতিহাসিক কল্পনাশক্তিকে এই বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা কঠিন নয়। মানুষ নিজেরাই পরিস্থিতির সমাধান খুঁজে নেয়, যেখানে সৃজনশীলতা যেমন দরকার, তেমনি দলগত কাঠামোর প্রতি একধরনের অবিশ্বাসও কাজ করে।’

দা মাত্তার চিন্তাধারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল সমাজবিজ্ঞানী গিলবার্তো ফ্রেইরের ভাবনায়। ফ্রেইরে ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে তার প্রথম কাজগুলো প্রকাশ করেন। তিনি মনে করতেন, ব্রাজিলের জাতিগত বৈচিত্র্য, বিশেষ করে খেলাধুলায়, একটি বড় শক্তি।



তিনি ‘চালাক প্রতারক’ চরিত্রটিকে উদযাপন করতেন, যাকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন এভাবে, ‘সাধারণত এক মিশ্র-জাতির মানুষ, যে বুদ্ধি খাটিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া কর্তৃত্বকে ফাঁকি দেয়।’

ফ্রেইরে লিখেছিলেন, ‘আমাদের ফুটবল ইউরোপীয় ফুটবল থেকে আলাদা, কারণ এতে আছে বিস্ময়কর কিছু বৈশিষ্ট্য, যথা: চাতুর্য, গতি, ব্যক্তিগত দক্ষতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা। আমাদের পায়ের কাজ, আমাদের ছলচাতুরি, বলের সঙ্গে খেলোয়াড়দের নাচন, এসবের মধ্যে নাচ আর কাপোয়েরার ছাপ রয়েছে, যা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলকে আলাদা করে তোলে।’

ডমিঙ্গোস দা গুইয়া, ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ডিফেন্ডার ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৬ সালের মধ্যে অল্প সময়ের জন্য বোকা জুনিয়র্সে খেলেছিলেন। ডিফেন্ডার হয়েও তিনি পেছন থেকে বল নিয়ে উঠে আসতেন, প্রতিপক্ষকে শরীরী ভঙ্গিতে কাটিয়ে দিতেন, যা সেই সময়ের জন্য ছিল একেবারেই অস্বাভাবিক।

তিনি বলেছিলেন, ‘ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে ভয় পেতাম। কারণ আমি প্রায়ই দেখতাম, কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়রা সামান্য ভুল করলেও মার খেত। আমার বড় ভাই বলত, ‘বিড়াল সবসময় পায়ের ওপর ভর করে নামে। তুমি কি ভালো নৃত্যশিল্পী নও?’ আমি ছিলাম। আর সেটা ফুটবলে আমাকে সাহায্য করেছে। আমি কোমর দোলাতে শুরু করি, ছোট ছোট পায়ে এগোতাম, যেন ড্রিবল করছি; এক ধরনের সাম্বা।’

এই ধরনের ফুটবলের মাঝেই ১৯৪৩ সালে ব্রাজিলে পৌঁছান সাস্ত্রে। তখনকার ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ছিল ব্যক্তিগত দক্ষতায় ভরপুর, নান্দনিকতায় উজ্জ্বল, কিন্তু কৌশলগতভাবে দুর্বল এবং সবচেয়ে বড় কথা, তা ছিল কার্যকারিতাহীন।

আর্জেন্টাইন ফুটবল ইতিহাসবিদ বেকারম্যান ব্যাখ্যা করেন, ‘ব্রাজিলিয়ানরা আনন্দের জন্য ফুটবল খেলত, নিজেদের দক্ষতা দেখানোর জন্য। সাস্ত্রের আগমনের পর তারা আরও কার্যকর হয়ে ওঠে, গোল করতে শেখে। সাস্ত্রে সেই নান্দনিক ফুটবলে কার্যকারিতা যোগ করেছিলেন।’

ব্রাজিলের পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব আন্তোনিও সাস্ত্রের ওপর চাপানো অবশ্যই হাস্যকর হবে, আজকাল মনোযোগ পাওয়ার জন্য যেসব অতিরঞ্জিত দাবি করা হয়, সেরকমই এক দাবি।

তবে এটাও সত্য যে ‘মায়েস্ত্রো’, যে নামে ১৯৫২ সালে পাকাইম্বু স্টেডিয়ামে ফিরে এলে ৮০ হাজারের বেশি দর্শক তাকে অভিবাদন জানিয়েছিল; তিনি শুধু সর্বকালের অন্যতম সেরা আর্জেন্টাইন ফুটবলারই ছিলেন না; তিনি এমন এক ফুটবল দর্শনের পরিবর্তনেও ভূমিকা রেখেছিলেন, যা তার আগমনের পর দ্রুত বিকশিত হয়।

সেই ফুটবলই পরে মারাকানাজোর ধাক্কা সামলে উঠে ১৯৫৮ সালে সুইডেনে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতে। আর সেই দলে ছিলেন পেলে নামের এক কিশোর, যিনি ছোটবেলা থেকেই আন্তোনিও সাস্ত্রের নাম শুনে বড় হয়েছেন, আদর্শ ভেবে।

টিজে/টিএ 

মন্তব্য করুন