মেসি-রোনালদিনহো:বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে জন্ম নেওয়া এক অবিস্মরণীয় বন্ধুত্বের গল্প, যা আজও কোটি ভক্তের হৃদয় ছুঁয়ে যায়
ছবি: সংগৃহীত
০৩:০১ পিএম | ১৮ জুলাই, ২০২৬
ফুটবলের জনপ্রিয়তা শুধু গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ডের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো এই খেলার সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লেখা হয় মানুষের সম্পর্ক নিয়ে। এমনই এক গল্পের রূপকার লিওনেল মেসি ও রোনালদিনহো। এটি শুধু দুই কিংবদন্তি ফুটবলারের গল্প নয়; এটি একজন বড় ভাইয়ের হাত ধরে আরেকজনের পৃথিবী জয় করার গল্প। এমন এক সম্পর্ক, যেখানে নেই হিংসা বা প্রতিযোগিতা; আছে শুধু ভালোবাসা, বিশ্বাস আর একজনের সাফল্যে আরেকজনের নিঃস্বার্থ আনন্দ।


আজকের পেশাদার ফুটবলে যেখানে প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা আর ব্যক্তিগত সাফল্যের লড়াই প্রায়ই সম্পর্ককে ম্লান করে দেয়, সেখানে রোনালদিনহো ও মেসির বন্ধুত্ব এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এই গল্প শেখায়, একজন মানুষ যদি নিঃস্বার্থভাবে আরেকজনের হাত ধরে, তবে সেই হাত ধরেই লেখা যেতে পারে ইতিহাস।

আজ মেসিকে সবাই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে চেনে। আটটি ব্যালন ডি'অর, বিশ্বকাপ ট্রফি, কোপা আমেরিকা, অসংখ্য রেকর্ড আজ তার ঝুলিতে। কিন্তু এই মহাতারকার গল্পটাও একদিন শুরু হয়েছিল এক লাজুক কিশোরকে দিয়ে।
২০০৪ সালে বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে পা রেখেছিলেন এক লাজুক, স্বল্পভাষী ১৭ বছরের কিশোর। নাম লিওনেল মেসি। নতুন পরিবেশ, নতুন সতীর্থ, আর চারপাশে বিশ্বের সেরা সব ফুটবলার। স্বাভাবিকভাবেই একটু অস্বস্তি, একটু ভয় ছিল তার মধ্যে। সেই সময়ই এগিয়ে এসেছিলেন সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলার রোনালদিনহো। তখন তিনি শুধু বার্সেলোনার নয়, গোটা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলারদের একজন ছিলেন। কিন্তু তারকা হওয়ার অহংকার তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরং তিনি নিজের পরম মমতায় নিজের কাছে টেনে নেন মেসিকে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে।
দিনদিন মেসি যেন হয়ে উঠেন রোনালদিনহোর মধ্যমণি। মেসিকে কখনওই চোখের আড়াল হতে দেননি। ড্রেসিংরুমে, অনুশীলনের মাঠে, এমনকি ম্যাচের মধ্যেও রোনালদিনহো যেন সব সময় খুঁজে বেড়াতেন সেই কিশোরকে। সুযোগ পেলেই বল বাড়িয়ে দিতেন তার পায়ে। যেন তিনি সবাইকে বলতে চাইতেন—"দেখো, এই ছেলেটিই একদিন পৃথিবী শাসন করবে।"

তার সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিচ্ছবি দেখা যায় ২০০৫ সালের ১ মে। আলবাসেতের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদিনহোর নিখুঁত পাস থেকে বার্সেলোনার জার্সিতে প্রথম গোল করেন মেসি। গোলের পর রোনালদিনহো যেভাবে আনন্দে মেসিকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, সেই ছবিটি আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। মনে হয়েছিল, যেন নিজের গোলের চেয়েও বেশি খুশি হয়েছেন তিনি।
সেদিন মেসির করা গোলটি শুধু একটি গোলই ছিল না। সেদিন জন্ম নিয়েছিল এক নতুন যুগের। রোনালদিনহো যেন নিজের হাতে ফুটবলের ভবিষ্যৎকে সবার সামনে তুলে দিয়েছিলেন। এরপর আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মেসিকে।

কিন্তু এক বনে দুই বাঘ থাকতে পারে না— পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তাই জানিয়ে দিয়েছিলেন, তার পরিকল্পনায় নেই রোনালদিনহো। লিওনেল মেসিকে মুখ্য চরিত্রে রেখে সাজিয়েছিলেন তার কৌশল। এজন্য ব্রাজিলিয়ান তারকার আক্ষেপ অনেক, মেসির সঙ্গে লম্বা সময় খেলা হয়নি যে তার। তবে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের প্রতি তার মুগ্ধতা সবসময়ের জন্যে ছিল।
পানেনকা ম্যাগাজিনে দেওয়া সাক্ষাৎকারের শুরুতে মেসি সম্পর্কে ব্রাজিলিয়ান তারকা বলেছেন, ‘বার্সেলোনায় আসার পরপরই আমি একটা ছোট ছেলের কথা শুনতে পাই। মেসির নাম আসলে তখনই ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর আমাদের বন্ধুত্ব হয়, আমরা একসঙ্গে খেলা শুরু করি এবং একে অন্যের বোঝাপড়ায় জায়গাটা বাড়তে থাকে।’
শুরুতে নিশ্চয় মেসিকে ফুটবলবিষয়ক অনেক পরামর্শ দিয়েছেন? রোনালদিনহোর সহজ উত্তর ছিল, ‘মেসির মধ্যে সবকিছুই আছে। আমার কাছ থেকে কোনও কিছুই ওর নিতে হয়নি। কিছু শেখাতেও হয়নি।’ তবে আর্জেন্টাইন তারকাকে পতুর্গিজ শিখিয়েছেন তিনি, ‘আমাদের সম্পর্ক সবসময়ই দারুণ। নতুন বিষয়ে আমরা শিখতাম, দেখা গেল ও আমাকে স্প্যানিশ শেখাচ্ছে, আমি ওকে শেখাচ্ছি পর্তুগিজ। তবে ফুটবল প্রসঙ্গে এলে আমাদের কিছু বলতে হতো না, একে অন্যকে নিখুঁতভাবে বুঝতাম।’

সময় বদলেছে। রোনালদিনহো বিদায় নিয়েছেন, আর মেসি হয়ে উঠেছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। ব্যালন ডি'অর, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, কোপা আমেরিকা, অবশেষে বিশ্বকাপ, একে একে সব স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি। কিন্তু সাফল্যের চূড়ায় উঠেও কখনো ভুলে যাননি সেই মানুষটিকে, যিনি শুরুতে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

মেসি বহুবার বলেছেন, বার্সেলোনায় প্রথম দিনগুলো সহজ ছিল না। কিন্তু রোনালদিনহো তাকে এমনভাবে আপন করে নিয়েছিলেন যে, খুব দ্রুতই সব ভয় কেটে যায় তার। অন্যদিকে, রোনালদিনহোও গর্বের সঙ্গে বলেছেন, মেসির সাফল্যে তিনি নিজের আনন্দ খুঁজে পান। কারণ তিনি জানতেন, এই ছেলেটি একদিন ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

আজ তারা একই ক্লাবে খেলেন না, একই ড্রেসিংরুমও ভাগ করেন না। তবুও যখনই দেখা হয়, দুজনের মুখে ফুটে ওঠে সেই পুরোনো হাসি। আলিঙ্গনে বোঝা যায় সম্পর্কটা কখনোই শুধুই সতীর্থের ছিল না; ছিল বড় ভাই আর ছোট ভাইয়ের।
হয়তো একদিন ফুটবল নতুন নতুন কিংবদন্তির জন্ম দেবে, নতুন রেকর্ডও গড়া হবে। কিন্তু বার্সেলোনার সেই ড্রেসিংরুমে জন্ম নেওয়া এই বন্ধুত্বের গল্প কখনো পুরোনো হবে না। কারণ এটি শুধু দুই ফুটবলারের গল্প নয়, এটি এমন এক সম্পর্কের গল্প-যেখানে একজনের হাসিতে আরেকজনের আনন্দ, একজনের স্বপ্নে আরেকজনের বিশ্বাস, আর একজনের সাফল্যে আরেকজনের গর্ব লুকিয়ে আছে। তাই কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে মেসি-রোনালদিনহোর এই বন্ধুত্ব চিরকাল বেঁচে থাকবে একটি সুন্দর স্মৃতি হয়ে, একটি অনুপ্রেরণা হয়ে,আর ফুটবলের সবচেয়ে মানবিক গল্পগুলোর একটি হয়ে।
টিএ/