সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল কী? ঢাকার যানজট কমাতে কতটা কার্যকর হবে নতুন এই ব্যবস্থা
ছবি: সংগৃহীত
০১:৩২ পিএম | ২১ জুলাই, ২০২৬
রাজধানীর ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বর্তমানে ১২টি মোড়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আগামী মাসের মধ্যেই এটি ৬০টির বেশি পয়েন্টে সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল আসলে কী? এটি কীভাবে কাজ করে? আর রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?
সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল কী?
সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল হলো এমন একটি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যেখানে সিগন্যাল নির্ধারিত সময় অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। তবে প্রয়োজন হলে ট্রাফিক পুলিশ বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সিগন্যালের সময় বাড়ানো, কমানো কিংবা পুরোপুরি ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ থাকে।
অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল এবং পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেমের মধ্যবর্তী একটি ব্যবস্থা।
কীভাবে কাজ করবে?
সাধারণভাবে এই ব্যবস্থায় প্রতিটি মোড়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাল, হলুদ ও সবুজ বাতি জ্বলবে। ট্রাফিক পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কন্ট্রোল প্যানেল থেকে সিগন্যালের সময় পরিবর্তন করতে পারবেন।
ধরুন, একটি মোড়ে হঠাৎ যানবাহনের চাপ বেড়ে গেল বা কোনো অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত পার করানোর প্রয়োজন হলো। সে ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সময়সূচি পরিবর্তন করে ট্রাফিক পুলিশ প্রয়োজন অনুযায়ী সিগন্যাল পরিচালনা করতে পারবেন।
বর্তমানে ঢাকায় কী অবস্থা?
ডিএমপির তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানীর ১২টি পয়েন্টে সেমি-অটোমেটিক সিগন্যাল চালু রয়েছে। আগামী মাসের মধ্যে এটি ৬০টির বেশি মোড়ে সম্প্রসারণ করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে রাজধানীর ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে গত প্রায় এক বছরে যানজট কমাতে নগরীর ৭৫টি পয়েন্টে সড়ক ডাইভারশন, ইউটার্ন এবং প্রকৌশলগত বিভিন্ন পরিবর্তনও করা হয়েছে।
কেন পুরোপুরি অটোমেটিক নয়?
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমানের মতে, উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে এখনই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যাল একটি কেন্দ্রীয় অ্যালগরিদমের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। সেন্সর ও ক্যামেরা যানবাহনের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক করে দেয় কোথায় কতক্ষণ সবুজ বাতি জ্বলবে।
কিন্তু বাংলাদেশের অনেক সড়ক পরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়নি। কোথাও সংকীর্ণ রাস্তা, কোথাও অনিয়মিত মোড়, কোথাও আবার অপরিকল্পিত সংযোগ সড়ক রয়েছে। ফলে উন্নত বিশ্বের সেই মডেল সরাসরি প্রয়োগ করা কঠিন।
এই ব্যবস্থার সুবিধা কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালু হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
-ট্রাফিক পুলিশকে প্রতিটি সিগন্যাল হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে না।
-প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিগন্যাল পরিবর্তন করা যাবে।
-যানবাহনের অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষার সময় কমতে পারে।
-একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও সমন্বিত হবে।
-ভবিষ্যতের স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি হবে।
-চ্যালেঞ্জও কম নয়
তবে শুধু প্রযুক্তি দিয়েই ঢাকার যানজট পুরোপুরি কমানো সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক ব্যবহারকারীদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত না হলে নতুন ব্যবস্থার সুফল সীমিত হতে পারে।
এ ছাড়া ভারী বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, হঠাৎ সড়ক অবরোধ কিংবা উন্নয়নকাজের কারণে অনেক সময় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ডিএমপি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে জিপিএসভিত্তিক ট্রাফিক নজরদারি, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সেই ব্যবস্থায় বিভিন্ন মোড় পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। কোনো এলাকায় যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগন্যালের সময় সমন্বয় করবে। এতে যান চলাচল আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেষ কথা
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে শুধু ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়িয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক সড়ক পরিকল্পনা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতার সমন্বয়ই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। সেই লক্ষ্যেই রাজধানীতে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর উদ্যোগকে স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এসএন