© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ভারত কি বাংলাদেশের পথেই হাঁটছে? Gen Z-এর উত্থান এবং মোদি সরকারের নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

শেয়ার করুন:
ভারত কি বাংলাদেশের পথেই হাঁটছে? Gen Z-এর উত্থান এবং মোদি সরকারের নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ছবি: সংগৃহীত

শাহাবুদ্দিন শুভ, প্রধান সম্পাদক : সিলেটপিডিয়া
১২:৪৭ পিএম | ২২ জুলাই, ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে কোনো রাজনৈতিক দল নেই, নেই কোনো ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন বা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব। বরং এই পরিবর্তনের মূল শক্তি হয়ে উঠছে এমন একটি প্রজন্ম, যারা ডিজিটাল যুগে বেড়ে উঠেছে, তথ্যপ্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে জানে এবং প্রচলিত রাজনৈতিক আনুগত্যের বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে সংগঠিত হতে পারে। এই প্রজন্মের নাম—জেনারেশন জেড বা Gen Z।

গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ—বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভারত—পর্যবেক্ষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিন দেশেই তরুণদের আন্দোলনের সূচনা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যু থেকে, কিন্তু ধীরে ধীরে সেগুলো বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন। পরে সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্রের জবাবদিহি, বৈষম্য, প্রশাসনিক আচরণ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের দীর্ঘদিনের হতাশা। নেপালেও একইভাবে তরুণদের ক্ষোভ কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। আর এখন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, সেটিও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

ভারতে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূত্রপাত সরকারি চাকরির পরীক্ষা, NEET-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত সংকট বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু আন্দোলন যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়েছে যে বিষয়টি কেবল পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লাখো তরুণের অভিযোগ, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করার পরও যদি দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সমস্যাটি শুধু একটি পরীক্ষার নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট।

ইতিহাস বলছে, অনেক বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে এমনই আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটি ইস্যু থেকে। আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আত্মাহুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। হংকংয়ের আন্দোলনের শুরু হয়েছিল প্রত্যর্পণ আইন নিয়ে বিতর্ক থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে "Black Lives Matter" প্রথমে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিবাদ ছিল, পরে তা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক আন্দোলনে পরিণত হয়। তাই ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি পরীক্ষা-সংক্রান্ত অসন্তোষ হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বাস্তবতাকে বোঝা যাবে না।

এই আন্দোলনে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পরিচয় হিসেবে শুরু হওয়া Cockroach Janata Party (CJP) খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কোনো আন্দোলন তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ একটি প্রতীককে নিজেদের ক্ষোভের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে। CJP-এর ক্ষেত্রেও অনেক পর্যবেক্ষক সেই প্রবণতা দেখতে পাচ্ছেন। এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তির কারণে নয়; বরং ডিজিটাল প্রজন্মের দ্রুত যোগাযোগ, ব্যঙ্গ, প্রতীক নির্মাণ এবং অংশগ্রহণের সংস্কৃতির ফল।

এই বাস্তবতাই Gen Z-কে আগের প্রজন্ম থেকে আলাদা করেছে। তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কোনো দল ক্ষমতায় আছে বা বিরোধী দলে আছে—এটি তাদের কাছে সব সময় প্রধান বিষয় নয়। তারা জানতে চায়, তাদের জন্য কর্মসংস্থান কোথায়, শিক্ষাব্যবস্থা কতটা সুষ্ঠু, রাষ্ট্র কতটা স্বচ্ছ এবং প্রশাসন কতটা জবাবদিহিমূলক। এই কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেমন Pew Research Center, World Economic Forum এবং UNDP, Gen Z-কে ভবিষ্যতের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করছে।

ভারতের বর্তমান আন্দোলনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। তাঁর অংশগ্রহণ আন্দোলনকে শুধু ছাত্রদের দাবি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং জাতীয় পর্যায়ে একটি নৈতিক প্রশ্নে পরিণত করেছে। একজন গ্রহণযোগ্য নাগরিক ব্যক্তিত্ব যখন কোনো আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান, তখন সেই আন্দোলনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব—দুটিই বৃদ্ধি পায়।

তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। ভারত কি বাংলাদেশের পথেই হাঁটছে? এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে খুঁজতে হবে। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো এক নয়। ভারতের ফেডারেল ব্যবস্থা, শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজনীতি, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। ফলে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভারতের ক্ষেত্রে হুবহু পুনরাবৃত্তি হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনও নেই।

তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি নতুন শক্তির উত্থান ঘটেছে, যার নাম Gen Z। এই প্রজন্ম কোনো দলের স্থায়ী ভোটব্যাংক নয়। তারা যেমন কোনো সরকারকে ক্ষমতায় আনতে পারে, তেমনি প্রয়োজন মনে করলে সেই সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচকেও পরিণত হতে পারে। এই বাস্তবতাই আজ ভারতের রাজনীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

এসএন শাহাবুদ্দিন শুভ 
প্রধান সম্পাদক : সিলেটপিডিয়া 
ahmedshuvo@gmail.com 

মন্তব্য করুন