© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

শেখ হাসিনার মতো ভুল করেননি নরেন্দ্র মোদি, তবে পরীক্ষা এখনও বাকি

শেয়ার করুন:
শেখ হাসিনার মতো ভুল করেননি নরেন্দ্র মোদি, তবে পরীক্ষা এখনও বাকি

ছবি: সংগৃহীত

শাহাবুদ্দিন শুভ, প্রধান সম্পাদক : সিলেটপিডিয়া
০৭:৩৭ পিএম | ২৮ জুলাই, ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ছাত্র আন্দোলন বহুবার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ৫২ ’র ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নেপালের গণআন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তরুণদের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন ভারতের চলমান ছাত্র-যুব আন্দোলনও সেই ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায় হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছাত্রদের দাবি নয়; বরং সরকার সেই দাবির প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।

রাজনীতির ইতিহাস বলে, অনেক সময় আন্দোলনের শক্তির চেয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়াই সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও কেউ কঠোর অবস্থান নেয়, কেউ সংলাপের পথ বেছে নেয়, আবার কেউ প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে জনঅসন্তোষ প্রশমিত করার চেষ্টা করে। ফলে আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতিও এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভিন্ন হয়।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যখন ছাত্রদের আন্দোলনের মুখোমুখি হয়, তখন সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল—আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মূল উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সংকট ধীরে ধীরে আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, শুরুতেই কার্যকর রাজনৈতিক সংলাপ, আস্থা তৈরির উদ্যোগ এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে না যাওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছেন বলে মনে হচ্ছে। শিক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে ছাত্রদের ক্ষোভ যখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন সরকার শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দিকেই নজর দেয়নি; আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগও নিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনে পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সংকট প্রশমনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। সরকারের এই বার্তা ছিল—তারা অন্তত আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে এবং পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার পথে হাঁটতে চায় না।

বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহে সংকট ক্রমেই রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়। অন্যদিকে ভারতে সরকার আপাতত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে। তবে এটাও সত্য যে, কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন বা কয়েকটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত কোনো আন্দোলনের স্থায়ী সমাধান নয়। আন্দোলনের মূল কারণ যদি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রশ্নফাঁস, কর্মসংস্থানের সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি হয়, তাহলে সেই সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি শান্ত রাখা কঠিন।

ভারতের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা শুধু একটি পরীক্ষার পুনঃআয়োজন চায় না; তারা এমন একটি ব্যবস্থা চায় যেখানে পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য থাকবে, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠিত হবে। এই কারণেই বর্তমান আন্দোলনকে অনেক পর্যবেক্ষক শুধু শিক্ষা-সংক্রান্ত আন্দোলন হিসেবে নয়, বরং তরুণদের আস্থা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।

রাজনৈতিকভাবে নরেন্দ্র মোদির জন্য এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কারণ তিনি যদি দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে পারেন এবং আন্দোলনের মূল অভিযোগগুলোর বিশ্বাসযোগ্য সমাধান দিতে সক্ষম হন, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যদি আন্দোলনকারীরা মনে করেন যে সরকারের পদক্ষেপ কেবল সাময়িক চাপ কমানোর কৌশল, তাহলে একই অসন্তোষ নতুন রূপে আবারও ফিরে আসতে পারে।

তাই এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে ভারতের আন্দোলনের পরিণতি কী হবে। তবে এটুকু বলা যায়, নরেন্দ্র মোদি অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা উঠেছিল—অর্থাৎ আন্দোলনের বার্তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা—সেই পথ অনুসরণ করেননি। তিনি রাজনৈতিক সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং পরিস্থিতিকে সংলাপ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।

কিন্তু রাজনীতিতে প্রথম সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত নয়। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বিচার করে, সংকট কতটা স্থায়ীভাবে সমাধান হলো। তাই বলা যায়, নরেন্দ্র মোদি আপাতত একটি বড় রাজনৈতিক ভুল এড়াতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। ছাত্রদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার কার্যকর সমাধান দিতে পারলেই কেবল বলা যাবে—তিনি সত্যিই সংকট মোকাবিলায় সফল হয়েছেন।

ভারতবাসীর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক এবং পর্যবেক্ষকরাও এখন সেই উত্তরটির অপেক্ষায় আছেন।


শাহাবুদ্দিন শুভ
প্রধান সম্পাদক : সিলেটপিডিয়া
ahmedshuvo@gmail.com

মন্তব্য করুন