© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ট্রাম্পের 'গলায় চাপ-মুখ সেলাই' রয়েছে সব ধরনের হুঁশিয়ারিযুদ্ধের সময় বিলবোর্ডকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার ইরানের

শেয়ার করুন:
যুদ্ধের সময় বিলবোর্ডকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার ইরানের

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১২:১৪ পিএম | ০৪ অক্টোবর, ২০২৬
তেহরানের সড়কজুড়ে বিশাল বিশাল বিলবোর্ড। কোথাও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গলায় চাপ দিয়ে ধরা হয়েছে, আবার কোথাও মুখ সেলাই করা হয়েছে, কোথাও আবার ইরানি সেনার বুটের নিচে দেখানো হয়েছে মার্কিন ড্রোনকে। এসব বিলবোর্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের নানা ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের বিজয়ের বার্তাও ছড়িয়ে দিচ্ছে ইরান।

তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের চোখে পড়ছে এসব বিলবোর্ড। এর মধ্যে শহরের বিখ্যাত ভ্যালিয়াসর স্কয়ারও রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে এই সব বিলবোর্ড অনেকটা 'ওয়ার ন্যারেটিভ' ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। 

ইরানের ‘খানেহ-য়ে তাররাহান’ বা ‘ডিজাইনার্স হাউস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে ট্রাম্পের বিশালাকৃতির একটি ব্যঙ্গচিত্র। এতে দেখা যায়, ট্রাম্পের ঠোঁট সেলাই করা এবং হরমুজ প্রণালির পানির মাধ্যমে তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি এই বিলবোর্ডে লেখা হয়েছে: ‘চূড়ান্ত সীমায়’।

প্রতিষ্ঠানটির স্টুডিও ব্যবস্থাপক, ৩২ বছর বয়সী, মোস্তাফা কাফায়ি বলেন, কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর এলেই তাদের দল দ্রুত কাজে নেমে পড়ে। প্রথমে বিভিন্ন ধারণা নিয়ে আলোচনা হয়, এরপর গ্রাফিক ডিজাইনারদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং সবাই মিলে চূড়ান্ত নকশা তৈরি করেন।

তিনি যখন এএফপির সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন স্টুডিও'র বিভিন্ন ডেস্কে কর্মীদের ব্যস্তভাবে কাজ করতে দেখা যায়। অফিসে রয়েছে ধারণা তৈরির জন্য একটি হোয়াইটবোর্ড। করিডরের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে নিহত ব্যক্তিদের ছবি এবং বিভিন্ন ডিজাইনের ধারণা।

কাফায়ির স্টুডিওতে আলাদা একটি মিডিয়া পর্যবেক্ষণ দলও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশটির অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গোষ্ঠীর অধীনে কাজ করে।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এসব বিলবোর্ডের অর্থায়ন করে এবং রাষ্ট্রীয় বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এগুলো ব্যবহার করা হয়।

তেহরানের আরেকটি বিলবোর্ডে ট্রাম্পকে একজন জাদুকরের বাক্সের ভেতরে আটকে থাকা অবস্থায় দেখানো হয়েছে। তার হাতে কোকাকোলার বোতল ও হ্যামবার্গার। পাশে লেখা, ‘চোখের পলক ফেললেই আপনি শেষ!’

গত জুলাইয়ে, তুরস্কে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে এই ব্যঙ্গচিত্রে। নিরাপত্তাজনিত হুমকির কারণে ট্রাম্পকে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে অন্য একটি বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কাফায়ি জানান, দ্রুততম সময়ে পোস্টার তৈরি করা এখন তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। কখনও কখনও মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই একটি জরুরি বিলবোর্ড তৈরি করে ফেলেন তারা। এ কাজে প্রায় আটজনের দল একসঙ্গে কাজ করে।

তার ভাষ্য, তাদের বেশিরভাগ কাজই ফটোশপে তৈরি হয়। পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন প্রযুক্তিতেও তারা দক্ষ। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় চ্যাটজিপিটি ও ‘ন্যানো ব্যানানা’সহ বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করা হয়।

তেহরানের সাম্প্রতিক আরেকটি বিশাল বিলবোর্ডে দেখা যায়, একজন ইরানি সেনা একটি মার্কিন পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোনের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাম্প্রতিক ‘হরমুজ ক্যাচ’ অভিযানের প্রতি ইঙ্গিত করে। বিলবোর্ডে লেখা, ‘ব্যবসা ভালোই চলছে।’

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করেছে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয়। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে অবরোধ জোরদার করেছে।

তেহরানের আরেকটি বিলবোর্ডে উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক পৌরাণিক যোদ্ধাকে দেখানো হয়েছে। পেছনে জ্বলছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। সেখানে লেখা, ‘শয়তানের বাহিনী আরব উপসাগরে ডুবে যাবে।’

নির্ভানা ব্যান্ডের বিখ্যাত ‘নেভারমাইন্ড’ অ্যালবামের প্রচ্ছদের আদলে তৈরি আরেকটি বিলবোর্ডে দেখা যায়, পানির নিচে ডলারের নোট আঁকড়ে ধরেছেন ট্রাম্প। পাশে বড় করে লেখা, ‘মহাবিজয়! হরমুজ প্রণালি।’

ভ্যালিয়াসর স্কয়ারের বিলবোর্ডে ট্রাম্পের মুখ এত বড় করে দেখানো নিয়ে শুরুতে তাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা ছিল বলেও জানান কাফায়ি। বিশেষ করে ঠোঁট সেলাই করা ট্রাম্পের ছবিটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। মে মাসে হরমুজ প্রণালি সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সময় বিলবোর্ডটি স্থাপন করা হয়।

তবে শেষ পর্যন্ত নকশাটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বার্তা দেবে বলে মনে করেন তারা।

কেন ট্রাম্পকে এত বেশি বিলবোর্ডে তুলে ধরা হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে কাফায়ি বলেন, ট্রাম্প নিজেই একজন ‘মিডিয়া ব্যক্তিত্ব’। তিনি গণমাধ্যমে কোনো পদক্ষেপ নিলে তারাও একই মাধ্যমে পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন।

তিনি পরিস্থিতিকে যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, প্রতিপক্ষ যদি নিয়মিত আক্রমণ চালিয়ে যায়, তাহলে তাদেরও প্রতিপক্ষের গতিবিধির ওপর নিবিড় নজর রেখে সেই অনুযায়ী জবাব দিতে হয়।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনাই নয়, তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় ইরান, নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তাদের মিত্রদের নিয়েও গৌরবগাথা তুলে ধরা হয়েছে। নিহত হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহর ছবিও দেখা গেছে এসব বিলবোর্ডে।

কাফায়ির মতে, এসব বিলবোর্ডের মাধ্যমে রাজনীতিতে খুব একটা আগ্রহ নেই এমন মানুষও দেশে কী ঘটছে, তার সামগ্রিক চিত্র সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন।

৫৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মাহমুদ রেজাই তেহরানের এমন একটি বিলবোর্ডের কথা স্মরণ করেন, যেখানে লেখা ছিল, ‘শয়তানের বিয়ের উপহার’। তার ধারণা, সম্প্রতি দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে কথিত মার্কিন হামলায় কয়েকজন নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছিল।

রেজাই বলেন, বিলবোর্ডটি দেখে এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে কয়েক মিনিট তিনি ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলেন। তার কাছে বার্তাটি অনেকটা ধাঁধার মতো মনে হয়েছিল।

তেহরানের জোমহুরি স্কয়ারে স্থাপন করা ট্রাম্পের ‘জাদুকরের বাক্সে বন্দি’ বিলবোর্ডটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ২৪ বছর বয়সী সাহার জাহেদির। একটি ফার্মেসিতে কাজ করেন তিনি।

জাহেদির মতে, যুদ্ধের মধ্যে অনেক মানুষই জীবনধারণের সংগ্রামে ব্যস্ত। ফলে প্রতিদিনের খবর অনুসরণ করার মতো সময় সবার থাকে না।

তার ভাষায়, এ ধরনের বিলবোর্ড চলমান ঘটনাগুলো সম্পর্কে মানুষকে জানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ, তেহরানের রাজপথে এখন এসব বিলবোর্ড শুধু বিজ্ঞাপন বা দেয়ালচিত্র নয়; যুদ্ধের বর্ণনা, রাষ্ট্রীয় বার্তা এবং রাজনৈতিক প্রচারেরও অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বকে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে ইরান সরকার।

সূত্র: আরব নিউজ, এনবিসি নিউজ। 

কেএন/এসএন


মন্তব্য করুন