আসছে নির্বাচনে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে ৩টি বড় রাজনৈতিক জোট। এর মধ্যে একটি হতে পারে বিএনপির নেতৃত্বে সমমনা দলের জোট, আরেকটি জামায়াতের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি ইসলামি দল নিয়ে এবং অন্যটি হতে যাচ্ছে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক জোট। ছোট-বড় দলগুলোর মধ্যে কে কোন জোটে যাবে, চলছে নিয়ে চলছে হিসেব নিকেশ।
বিএনপি-জামায়াত, রাজনীতির মাঠে এক সময়ের চিরবন্ধু ও সহযোগী দুই দল। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদেও জোটবদ্ধ নির্বাচন করে সরকার গঠন করেছিল তারা। এরপর ২০০৮ এর নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে ছিল বিরোধীদলে।
শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আওয়ামী ক্ষমতাকালে গেল ১৭ বছরেও রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন দুই দলের নেতাকর্মীরা। জুলাই-আগস্টে আওয়ামী বিরোধী যুগপৎ আন্দোলনেও সঙ্গী হিসেবে কৃতিত্ব দাবি করেছে বিএনপি-জামায়াত।
তবে ৫ই আগস্টের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির ছক। শেখ হাসিনার পতনে সহযাত্রী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে আওয়ামী বিরোধী এই জোট। রাজনীতির মাঠে মিত্র দুই দলের মধ্যে এখন যোজন যোজন দূরত্ব।
অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবের কেন্দ্রে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে আসছে নতুন রাজনৈতিক দল। এরই মধ্যে নতুন দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিতে পদত্যাগ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ নতুন দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কথা নিশ্চিত করেছেন আন্দোলনের বেশ কয়েকজন সমন্বয়ক। ধারণা করা হচ্ছে, ছাত্র ও তরুণ জনতার মিলন ঘটবে নতুন দলে। সবমিলিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এই অবস্থায় আগামী নির্বাচনকে ঘিরে, কে কোন জোটের দিকে ঝুঁকছে, তা নিয়ে এখন ব্যাপক সরব রাজনীতির মাঠ। বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মূল লড়াই হবে ৩টি বড় রাজনৈতিক জোটের মধ্যে। সমমনা দলগুলোকে নিয়ে কিছু আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচন করবে বিএনপি।
সেক্ষেত্রে বিএনপির সাথে চীন সফরে থাকা দলগুলোর সাথেই জোট হতে পারে বলে ধারনা অনেকের। অন্যদিকে জামায়াতের চেষ্টা সবগুলো ইসলামী দলকে একই ব্যালটে ঐক্যবদ্ধ করা। সেক্ষেত্রে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে নতুন যে দল আসছে, তারা বিএনপি বা জামায়াত কারো সাথে জোট না করার সম্ভাবনাই বেশি। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তরুণ রাজনৈতিক দলগুলোকেই জোটে ভেড়ানোর চেষ্টা করবেন তারা।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘বিএনপি সমমনা প্রায় ৮-১০টা দলের নেতৃবৃন্দরা এক সাথে চীন যাচ্ছেন। এখন এটা নিয়ে বেশ গসিপ আছে, তারাই সম্ভবত জোট করতে যাচ্ছেন। অবশ্য বিএনপি এখনও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। আমরা দেখেছি জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোও বোঝাপড়ার চেষ্টা করছে। তারাও হয়তো একটা জোট বা বলয় তৈরি করতে চাচ্ছে। অন্যটি হতে পারে ছাত্রদের নেতৃত্বে নতুন কোনো জোট। যারা বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি করবেন না তারা ছাত্রদের দলে যোগ দিতে পারেন।’
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরর ভাষ্য, ‘৪২টি রাজনৈতিক দল, আওয়ামীবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন করেছি। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতসহ তাদের প্রত্যেকেরই একটা বোঝাপড়া আছে। এখন বিষয় হচ্ছে একটা বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ মাঠে নাই। সে হিসেবে নতুন সরকারের তো একটা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ দরকার।’
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের ফাংশনাল কার্যকারিতা ও ক্ষমতাসীন দলের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগের মতো বিরাট জোট ভোটের মাঠে না থাকলে বিএনপি’র সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। কাজেই যেকোনো জোটকেই টেক্কা দিতে দরকার হবে সমকক্ষের ও সমশক্তির নতুন জোট।
জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে ছোট দলগুলো বলছে, মানুষ তো পুরনো রাজনীতি দেখেছে। বড় দলের সঙ্গে জোট করলেও অনেক দলই হারিয়ে যায়। এমন উদাহরণ রাজনীতির ইতিহাসে ভুরি ভুরি। দুই তিনটা আসন জেতার জন্য ছোট দল রাজনীতি করে না। তারা চায় স্বকীয়তা ও গুরুত্ব।
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী জানান, আগেও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন ছাড়াআবার যাদের নিবন্ধন ছিল তারা নিজদলের মার্কাতেই ভোট চেয়েছে। কিন্তু তারা বিএনপি জোটের অংশ ছিল। কাজেই জোট করতে বাধা নেই। জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠনেও বিএনপি’র সমস্যা নেই।
অন্যদিকে জামায়াত জানিয়েছে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবে। সংসদীয় সব আসনে ভোট করার প্রস্তুতি নিয়েই তারা এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে একটি জোটের রূপরেখা রয়েছে দলটির অভ্যন্তরীণ আলোচনায়।
ছাত্র নেতৃত্বের নতুন দলের ঘোষণা আসার পর এটি অন্তত পরিষ্কার, আসন্ন নির্বাচনে সঙ্গী হবে না বিএনপি-জামায়াত। নির্বাচন কিংবা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার- কোনোটিতেই এক জোটে থাকছে না তারা। বরং ছাত্রশক্তির বিরুদ্ধে আলাদা প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে এই দুই দল।