ট্রাম্পের প্রশংসায় মাচাদো থাকলেও পাশ কাটিয়ে কেন রদ্রিগেজকে বেছে নিল যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনার পর থেকে যেসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার মধ্যে একটি প্রশ্ন হলো— প্রাক্তন মার্ক্সবাদী গেরিলার কন্যা এবং ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক নিকোলাস মাদুরোর সহকারী ডেলসি রদ্রিগজ কী কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের নজর কেড়েছে? কেন ওয়াশিংটন বিরোধী নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোকে সমর্থন করার পরিবর্তে একজন ‘চাভিস্তা’ বিপ্লবীকে ক্ষমতায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

ভেনেজুয়েলায় নিযুক্ত একজন প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মতে, উত্তরটি সহজ। তিনি বলেন, ‘তারা গণতন্ত্রের চেয়ে স্থিতিশীলতার পক্ষে গেছে’, এমনটাই বলেছেন চার্লস শাপিরো। তিনি ২০০২-০৪ সাল পর্যন্ত কারাকাসে জর্জ ডব্লিউ বুশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি আরো বলেন, ‘তারা স্বৈরশাসক ছাড়াই স্বৈরশাসক শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে।
দোসররা এখনো আছে। আমি মনে করি, এটি নরকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ।’

কিন্তু এর বিকল্প পথগুলো আরো ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে আছে পুরো শাসনব্যবস্থা একবারে বদলে ফেলা এবং মাচাদোর নেতৃত্বাধীন বিরোধী আন্দোলনকে সরাসরি সমর্থন করা।

এসব পদক্ষেপের সঙ্গে নানা বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। যেমন—বিরোধী নেতাদের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ বিভক্তি তৈরি হতে পারে। আবার ভেনেজুয়েলার বড় একটি অংশের মানুষ, যারা মাদুরোকে ভোট দিয়েছিলেন (সংখ্যায় প্রায় ৩০ শতাংশ) তাদেরও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শনিবার সকালে এক নাটকীয় সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক পর্যবেক্ষককে চমকে দেন।

তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদোকে ভেনেজুয়েলার ভেতরে তেমন ‘সম্মানিত’ নন বলে মন্তব্য করেন, অন্যদিকে তিনি ডেলসি রদ্রিগেজকে ‘দয়ালু’ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন।

কারাকাসে মার্কিন দূতাবাসের প্রাক্তন ডেপুটি চিফ অব মিশন কেভিন হুইটেকার বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কর্তৃক মারিয়া করিনা মাচাদোকে অযোগ্য ঘোষণার কথা শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। তার আন্দোলনটি নির্বাচনে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল। তাই মাচাদোকে অযোগ্য ঘোষণা করার মানে কার্যত পুরো আন্দোলনকেই অযোগ্য ঘোষণা করা।’

যেভাবে খুব দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে মাদুরোকে সরিয়ে দিয়ে রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে, তাতে কিছু পর্যবেক্ষকের মনে সন্দেহ জেগেছে—এই পরিকল্পনার সঙ্গে হয়তো সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট নিজেই জড়িত ছিলেন।

সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা লিন্ডসে মোরান বলেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। আমরা শুধু মাদুরোকেই লক্ষ্য করেছি, কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট অক্ষত থেকে গেছেন।’

তিনি আরো বলেন, এতে বোঝা যায়, ভেতরে কোনো উচ্চপর্যায়ের তথ্যসূত্র ছিল এবং তার ধারণা, সেই সূত্রগুলো ভাইস প্রেসিডেন্টের দপ্তরেই ছিল। তবে কারাকাসে থাকা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফিল গানসন এই ষড়যন্ত্রের ধারণার সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ এবং কট্টর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো ক্যাবেলোর হাতে বিপুল ক্ষমতা রয়েছে এবং তারা দুজনই মাদুরোর ঘনিষ্ঠ ও অনুগত। এমন অবস্থায় এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব টেকে না।

গানসনের প্রশ্ন, ‘যারা আসলে অস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের বিরুদ্ধেই বা কেন কেউ মাদুরোকে ফাঁদে ফেলবে এবং তাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেবে?’ এর বদলে, মাচাদোকে ক্ষমতায় বসালে দেশজুড়ে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে—এই সতর্কতার পরই রদ্রিগেজকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অক্টোবরে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রশ্নে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মাদুরো-পরবর্তী যেকোনো পরিস্থিতিতেই সহিংসতার ঝুঁকি অবহেলা করা উচিত নয়।’ এতে আরো সতর্ক করা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অংশ নতুন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করতে পারে। গানসন বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের লোকজনকে সতর্ক করেছিলাম, এ কাজ করবে না। সহিংস বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, এটা আপনার দোষ হবে এবং আপনিই এর জন্য দায়ী থাকবেন।’

সোমবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি গোপন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের কথা জানিয়েছে, রদ্রিগেজসহ মাদুরো শাসনের সদস্যরা একটি অস্থায়ী সরকার পরিচালনা করার জন্য আরো ভালো অবস্থানে ছিলেন।

হোয়াইট হাউস এই প্রতিবেদনে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা অদূর ভবিষ্যতে রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করছে।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আমেরিকা প্রোগ্রামের সহযোগী ফেলো হেনরি জিমার বলেছেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছুটা কঠোর বাস্তববাদ রয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো সবেমাত্র শুরু হয়েছে। মাদুরোর দখল ছিল সহজ অংশ। ভেনেজুয়েলার বৃহত্তর পুনর্গঠন, তেল, মাদক এবং গণতন্ত্রের লক্ষ্য... বাস্তবায়িত হতে আরো অনেক সময় লাগবে।’ তবে, আপাতত রদ্রিগেজকে এমন একজন ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছে, যাকে ট্রাম্প প্রশাসন মোকাবেলা করতে পারে বলে মনে করে।’

গানসন বলেন, ‘তিনি কিছুটা অর্থনৈতিক সংস্কার করেছিলেন। তিনি অর্থনৈতিক উন্মুক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন এবং বিদেশি পুঁজি ফিরিয়ে আনার ধারণার বিরুদ্ধে নন।’

এদিকে হেনরি জিমার মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অনুরোধ মানা রদ্রিগেজের জন্য খুব কঠিন হবে না। যেমন—মার্কিন তেল কম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় কাজ করতে দেওয়া, মাদকবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরো বড় পরিসরে সহযোগিতা করা, এমনকি কিউবা, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক কিছুটা কমিয়ে আনা। বিশেষ করে যদি এর বিনিময়ে ধাপে ধাপে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

জিমার বলেন, ‘আমি মনে করি তিনি এটা করতে পারবেন।’ তবে আরো বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ভেনেজুয়েলাকে গণতান্ত্রিক পথে নিতে চায়, তাহলে সেটা অনেক বেশি কঠিন হবে।’ এই মুহূর্তে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে আছে বলে মনে হচ্ছে না।

বুধবার প্রেসকে দেওয়া মন্তব্যে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার জন্য তিন-পর্যায়ের পরিকল্পনার কথা বলেছেন। যার মধ্যে রয়েছে দেশকে স্থিতিশীল করা এবং মার্কিন তত্ত্বাবধানে ৩০-৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিপণন। ভেনেজুয়েলার সংবিধানের ২৩৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, যদি কোনো রাষ্ট্রপতি দীর্ঘ সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন করাতে হবে। এই নিয়মটি প্রযোজ্য হতে পারে যদি মাদুরো নিউ ইয়র্কে কারাগারে থাকেন এবং বিচার প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকেন।

কিন্তু সোমবার এনবিসি নিউজকে সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, নতুন নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের আগে দেশ ঠিক করতে হবে। তখনই নির্বাচন সম্ভব।’

বিশ্লেষক গানসন বলেন, স্বল্প সময়ের জন্য শাসন পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের জন্য যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। তবে মধ্যম বা দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্বাচনের কোনো পরিকল্পনা না থাকাটা হতাশাজনক। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প হয়তো কিছু পাচ্ছেন, কিন্তু সাধারণ ভেনেজুয়েলারা তা পাচ্ছে না। মানুষ বিভ্রান্ত।’

ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার দুর্নীতিপূর্ণ এবং ধ্বংসপ্রায় পেট্রোলিয়াম অবকাঠামোতে আন্তর্জাতিক তেল কম্পানির বিনিয়োগ নিয়ে ভাবছে। গানসন বলেন, ‘যদি সরকার অবৈধ হয় এবং আইনের শাসন না থাকে, তবে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ কেউ করতে আসবে না।’

২০১৩ সালে তার মৃত্যুর আগে ভেনেজুয়েলার সাবেক নেতা হুগো শ্যাভেজ মাদুরোকে তার উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। তখন এটা ‘দেদাজো’ হিসেবে পরিচিত হয়েছিল—স্প্যানিশ ভাষায় মানে হলো ‘আঙুলের ইশারা’, অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচিত নেতা, যা সাধারণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে যায়।

এসকে/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে এম এ খালেক জানালেন, জোনায়েদ সাকিকে সংসদে পাঠাতে হবে Jan 10, 2026
img
নেত্রকোনায় ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেল ২ শ্রমিকের Jan 10, 2026
img
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে জাতীয় দলে ফেরার চেষ্টা নেইমারের Jan 10, 2026
img
উগ্রবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে তারেক রহমানের বিকল্প নেই: মতিউর রহমান Jan 10, 2026
img
হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্তরা এখনো আইনের আওতার বাইরে: জামায়াত আমির Jan 10, 2026
img
আপিল শুনানির প্রথম দিনে কারা প্রার্থিতা ফিরে পেলেন ও হারালেন Jan 10, 2026
img
মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানী করা মানে দেশের স্বাধীনতা অর্জনকেই অস্বীকার করা: কামরুল হুদা Jan 10, 2026
img
চাঁদপুর-২ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেলেন মানসুর আহমদ সাকী Jan 10, 2026
img
৭-০ গোলে জয় ঋতুপর্ণাদের Jan 10, 2026
img
তারেক রহমানের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ একটি বৈঠক হয়েছে : জমিয়ত মহাসচিব Jan 10, 2026
img
বাংলাদেশ ইস্যুতে বিপাকে আইসিসি সভাপতি! Jan 10, 2026
img
প্যারোলে মুক্তি পেয়ে বাবার জানাজায় অংশ নিলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা Jan 10, 2026
img
নিউজিল্যান্ড সিরিজে গিলের ভরসা কোহলি ও রোহিত Jan 10, 2026
সাংবাদিকদের নির্যাতনের কথা তুলে ধরলেন মাহমুদুর রহমান Jan 10, 2026
img
বিশ্বকাপে কঠিন গ্রুপে পড়েছে আর্জেন্টিনা: স্কালোনি Jan 10, 2026
img
প্রভাসের সিনেমার প্রভাবে প্রথমবারের মতো বক্স অফিসে চাপে পড়েছে ‘ধুরন্ধর’ Jan 10, 2026
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় কারা-পণ্য Jan 10, 2026
img
বিএনপির প্রার্থীর সভায় আওয়ামী লীগ নেতার ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ভাইরাল Jan 10, 2026
জনগণের দাবিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাচ্ছে বিদেশি শক্তি: আরাগচি Jan 10, 2026
ইরানে ফেরার প্রস্তুতি পাহলভির, শহরের কেন্দ্র দখলের আহ্বান Jan 10, 2026