পরবর্তী সরকারকে জুলাই সনদ লঙ্ঘনের পথ অন্তর্বর্তী সরকার দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের নামে যতটুকু করেছে, তার প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বাস্তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। সংস্কার প্রতিরোধক মহল অপশক্তির কাছে এই সরকার আত্মসমর্পণ করেছে। এ ছাড়া জুলাই সনদকে যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘনের মাধ্যমে নেতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর ধানমণ্ডির মাইডাস ভবনে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তুলে ধরার লক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের একটি অংশ বেশি প্রভাবশালী। উপদেষ্টা পরিষদ কোন কাগজে স্বাক্ষর করবে, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, সেটি আসলে উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ সিদ্ধান্ত নেন আমলাতন্ত্রের ভেতরের অত্যন্ত ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের নতিস্বীকার করার কারণ জানতে চাইলে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর আমার কাছে নেই। তবে দীর্ঘ সময় সরকারকে কাছ থেকে দেখে বুঝেছি, কোন সিদ্ধান্তে কোন উপাদান থাকবে, কোনটি থাকবে না, তা নির্ধারণ করে দেয় আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশ। এ ক্ষেত্রে শুধু তাদের গোষ্ঠীস্বার্থ নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থেরও প্রতিফলন ঘটে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হওয়া অধ্যাদেশগুলোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হয়। এ নিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সামান্য কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সরকার একতরফাভাবে অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসড়া অধ্যাদেশ স্বল্প সময়ের জন্য লোকদেখানোভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দায় কাটানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে, এমনকি বিরাগভাজন হয়ে কোনো কোনো অংশীজন অধিপরামর্শের সুযোগ করে নিয়েছে। তবে সেসব ক্ষেত্রেও তাদের প্রতিশ্রুত সংশোধন কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া অবহেলিত হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো অংশীজনদের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে অপপ্রচার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি অধ্যাদেশগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের তুলনায় আমলাতন্ত্রসহ ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র ও জবাবদিহিহীন কর্তৃত্বের চর্চা অব্যাহত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকার সার্বিকভাবে আইন প্রণয়ন ও জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের চর্চার উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। গণভোটের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়নের কোনো বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশনের স্বপ্ন সম্পূর্ণভাবে ধুলিস্যাৎ করা হয়েছে। লোক দেখানো এ অধ্যাদেশে এমন অনেক উপাদান রয়েছে যে এর ওপর ভিত্তি করে গঠিত তথাকথিত পুলিশ কমিশন অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাদের ক্ষমতার অব্যাহত অপব্যবহারের রিসোর্ট ছাড়া আর কিছুই হবে না। সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে উল্লেখযোগ্য যুগোপযোগী ইতিবাচক বিধান থাকলেও প্রতিটিতে নিজস্ব আঙ্গিকে ও সামষ্টিকভাবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে কোনো প্রকার বিচারিক সুরক্ষা ছাড়া জবাবদিহিহীনভাবে বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমত ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনের আইনগত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনের চেয়ারপারসন ও সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটির গঠন ও কর্মপদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে। ফলে কমিশন গঠন ও কাজে ক্ষমতাসীন সরকারের পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব ও স্বার্থের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
দুদক অধ্যাদেশ সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দুদক সংস্কার কমিশনের আশু করণীয় সুপারিশমালা সরকার বা দুদকের নিকট প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। অন্যদিকে অন্য কোনো অংশীজনকে সম্পৃক্ত না করে দুদক ও সরকারি আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই অধ্যাদেশের কারণে, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার বাছাই কমিটির কার্যকরতা কমেছে এবং সরকারি দলের প্রভাব বাড়বে।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ কাঠামো এবং বিষয়বস্তু এখনো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অপরাধ ও দণ্ড ধারা ২৬ (১) ও (২) সংক্রান্ত অপরাধ বিশেষ করে সাইবার স্পেসে ধর্মীয় বা জাতিগত বিষয়ে সহিংসতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রকাশে জেল জরিমানার অপব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (ধারা ৫) পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকায় কনটেন্ট ব্লকিংয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠবে। এ ছাড়া সরকারের বাইরে অংশীজনের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব না থাকার শঙ্কা এবং পুরো জাতিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও স্বার্থেও দ্বন্দ্বের ঝুঁকি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এসএস/টিএ