গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ আলোচনায় অংশ নিতে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউজে যাচ্ছেন ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিনের মিত্র ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করার পর এই আলোচনা ঘিরে ব্যাপক গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, এই আলোচনায় গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোটজফেল্ডও অংশ নেবেন। গ্রিনল্যান্ডের সরকার ও ডেনমার্ক- উভয়ই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।

প্রায় এক বছর আগে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, বিস্তৃত কিন্তু স্বল্প জনবসতিপূর্ণ এই আর্কটিক দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে, গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় প্রাণঘাতী হামলার নির্দেশ দিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টকে অপসারণ ও অপহরণের পর তিনি আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

রাসমুসেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে এই বৈঠকের উদ্যোগ নেন। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে হোয়াইট হাউজে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এতে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান।

বৈঠকের অনুরোধ জানিয়ে রাসমুসেন বলেন, তিনি কিছু ‘ভুল বোঝাবুঝি’ পরিষ্কার করতে চান। তবে ট্রাম্প প্রশাসনও বিষয়টিকে ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে দেখছে কি না ও তারা অবস্থান থেকে সরে আসতে আগ্রহী কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) গ্রিনল্যান্ডের এক নেতা দ্বীপটি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবেই থাকতে চায়- এমন মন্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, এমনটি হলে সেটা তাদের সমস্যা। তিনি আরও বলেন, আমি লোকটাকে চিনি না, তবে এটা তার জন্য বড় সমস্যা হতে যাচ্ছে।

শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ড চান তারা পছন্দ করুক বা না করুক। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি সহজ পথে না হয়, তাহলে কঠিন পথেই করবো।

ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়া বা চীনের সম্ভাব্য দখল ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলতে থাকায় আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীন উভয় দেশই তৎপরতা বাড়িয়েছে, তবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর কোনো দেশই আনুষ্ঠানিক দাবি করেনি।

উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ ধারণার প্রতিধ্বনি তুলে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তার প্রয়োজন। ৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড যুক্ত হলে আয়তনের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার পর চীন ও কানাডাকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হয়ে উঠবে।

সহযোগিতা সম্ভব কি না

চলতি বছরের মার্চে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কোনো আমন্ত্রণ ছাড়াই গ্রিনল্যান্ড সফর করেন। তিনি দ্বীপটির দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পিটুফিকে অবস্থান করেন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি।

ভ্যান্স তার কড়া অবস্থানের জন্য পরিচিত। ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে এক বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে প্রকাশ্যে তিরস্কার করার মধ্য দিয়ে তার সেই রূপ দেখা যায়।

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে এই বৈঠক গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত থাকবে কি না, তা এখনো জানানো হয়নি। যদি বৈঠকটি রুদ্ধদ্বার হয়, তাহলে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত উত্তপ্ত পরিস্থিতির সম্ভাবনা কমে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পেনি নাস বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ‘যে কোনো মূল্যে গ্রিনল্যান্ড চাই’ এই অবস্থানে অনড় থাকে, তাহলে বৈঠকটি খুব সংক্ষিপ্ত হতে পারে। তবে যদি অবস্থানে সামান্য নমনীয়তা থাকে, তাহলে ভিন্ন ধরনের আলোচনা সম্ভব হতে পারে।

হোয়াইট হাউজে বৈঠকের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেন, একটি বিষয় সবার কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় যেতে চায় না, যুক্তরাষ্ট্রের শাসনে যেতে চায় না ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশও হতে চায় না।

তার পাশে দাঁড়িয়ে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের কাছ থেকে আসা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য চাপের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সহজ ছিল না।

ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে যে তারা রাশিয়া ও চীনের হুমকি থেকে গ্রিনল্যান্ডকে সুরক্ষা দিচ্ছে না। দেশটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আর্কটিকে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে তারা প্রায় ৯০ বিলিয়ন বা ৯ হাজার কোটি ক্রোনার (প্রায় ১৪ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার) বিনিয়োগ করেছে।

ডেনমার্ক ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং আফগানিস্তান ও বিতর্কিতভাবে ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সেনাবাহিনী অংশ নিয়েছিল।

গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত ভৌগলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সেখানে উচ্চপ্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত বিরল খনিজের বিপুল মজুত রয়েছে। প্রায় ৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সাল থেকে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছে। তবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের হাতে রয়েছে।

সূত্র: এএফপি

এমআই/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে প্রস্তুত বিজিবি; কেউ যেন ভোটের প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত না ঘটায়: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা Jan 14, 2026
img
‘ইন্ডাস্ট্রিতে আমার কোনো প্রেমিক নেই’, জানালেন মিমি চক্রবর্তী Jan 14, 2026
img
‘আপাতত সিদ্ধান্ত’ আসন সমঝোতার সংবাদ সম্মেলনে থাকছে না ইসলামী আন্দোলন! Jan 14, 2026
img
চবিতে অভিযান চালাচ্ছে দুদক, এক সিন্ডিকেটে দেড় শতাধিক নিয়োগ Jan 14, 2026
img
উয়েফা থেকে ২০৫৮ কোটি টাকা আয় পিএসজির, বাকি কোন ক্লাবের আয় কত? Jan 14, 2026
img

আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ

মোবাইলের দাম কমতে পারে ২০ শতাংশ Jan 14, 2026
img
বিএনপিতে যোগ দিলেন এনসিপির শতাধিক নেতা-কর্মী Jan 14, 2026
img
শতাধিক গুম ও খুনের মামলায় বিচার শুরু জিয়াউলের Jan 14, 2026
img
জামায়াতের জোটে ইসলামী আন্দোলন থাকছে কি না ঘোষণা আজ দুপুরে Jan 14, 2026
img
মার্চে আসছে স্যামসাং গ্যালাক্সি S26: নতুন চমকে ঠাসা আল্ট্রা মডেল! Jan 14, 2026
img
নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল Jan 14, 2026
img
মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করলো যুক্তরাষ্ট্র Jan 14, 2026
img
৩ দফা দাবিতে মধ্যরাতে খুবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ Jan 14, 2026
img
গণ অধিকার পরিষদ ছেড়ে আসা প্রসঙ্গে মুখ খুললেন রেজা কিবরিয়া Jan 14, 2026
img
চলছে পঞ্চম দিনের আপিল শুনানি: কমিউনিস্ট পার্টির চারটিই বৈধ Jan 14, 2026
img
প্রথম ঘণ্টায় ৩৬ আপিল শুনানি, ৫ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল Jan 14, 2026
img
সাবেক সেনাকর্মকর্তা জিয়াউলের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ ট্রাইব্যুনালের, সাক্ষ্যগ্রহণ ৮ ফেব্রুয়ারি Jan 14, 2026
img
‘টক্সিক’ বিতর্কে যশের পুরনো মন্তব্য ভাইরাল Jan 14, 2026
img
পোস্টাল ব্যালট গণনার ভিডিও ভাইরাল, ইসির কাছে আইনি ব্যবস্থার দাবি বিএনপির Jan 14, 2026
img
পাবনার ২ আসনের সীমানা নিয়ে ‘লিভ টু আপিলের’ শুনানি আগামীকাল Jan 14, 2026