একসময় হিউস্টনের এক কিশোরী মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাইত। তার স্বপ্ন ছিল অনেক বড়, কিন্তু পথটা ছিল অনিশ্চিত। সেই কণ্ঠের ভেতরেই তখন লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের এক সাম্রাজ্যের ইশারা। বছর ঘুরে আজ, সেই বিয়ন্সে নোলস শুধু বিশ্বখ্যাত পপ তারকা নন; তিনি এখন বিলিয়ন ডলারের মালিক, সংগীত ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের একজন। বিয়ন্সের এই গল্পটা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এটি গড়ে উঠেছে সময় নিয়ে, পরিকল্পনা নিয়ে। সংগীতজগতে তারকার অভাব নেই। কিন্তু এমন শিল্পী খুব কমই আছেন, যারা শুধু জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠেন না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদেরকে রূপান্তরিত করেন একটি প্রতিষ্ঠানে।
বিয়ন্সে নোলস ঠিক তেমনই এক নাম। মঞ্চের আলো, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর ভক্তদের উন্মাদনার বাইরে তিনি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রও বটে। ফোর্বসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিয়ন্সে এখন আনুষ্ঠানিকভাবেই একজন বিলিয়নিয়ার। এই অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি সংগীতশিল্পীদের অভিজাত ‘বিলিয়নিয়ার ক্লাব’-এ যুক্ত হলেন, যেখানে তাঁর আগে জায়গা করে নিয়েছেন জে-জেড, টেইলর সুইফট, ব্রুস স্প্রিংস্টিন ও রিয়ানা।
সংখ্যার হিসাবে এটি হয়তো একটি মাইলফলক, কিন্তু বাস্তবে এটি বিয়ন্সের দুই দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে তোলা সৃজনশীল ও ব্যবসায়িক দর্শনেরই স্বীকৃতি। বিয়ন্সের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায় ২০০৮ সাল। সেই সময় ক্যারিয়ারের শিখরে থেকেও বিয়ন্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় তিনি তৈরী করেন নিজের বিনোদন প্রতিষ্ঠান ‘পার্কউড এন্টারটেইনমেন্ট’। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু বাস্তবে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর ভবিষ্যৎ সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর।
পার্কউডের মাধ্যমে বিয়ন্সে একে একে নিজের সংগীত, কনসার্ট, ভিজ্যুয়াল অ্যালবাম, তথ্যচিত্র-সব কিছুর মালিকানা নিজের হাতে তুলে নেন। ঝুঁকি ছিল বড়, খরচও কম নয়। কিন্তু লাভের বড় অংশও যে তখন তাঁরই হবে, সেই সাফল্যের হিসাবটা তিনি আগেই কষে ফেলেছিলেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলো বিয়ন্সের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ‘রেনেসাস ওয়ার্ল টুর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে, যা তাঁকে আবারও প্রমাণ করে দেয় লাইভ পারফরম্যান্সের অবিসংবাদিত রানি হিসেবে। এই ট্যুর শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই নয়, নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও ব্যাপক প্রশংসা পায়। পরের বছর, ২০২৪-এ মুক্তি পায় তাঁর আলোচিত কান্ট্রি ঘরানার অ্যালবাম ‘কাউবয় কার্টার’।
ঘরানা বদলের এই সাহসী সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত, কিন্তু বিয়ন্সে আবারও দেখান-তিনি নিয়ম ভাঙতেই স্বচ্ছন্দ। এই অ্যালবামই পরবর্তীতে ২০২৫ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী কনসার্ট ট্যুরের ভিত্তি হয়ে ওঠে। মার্কিণ ব্যবসাবিষয়ক প্রকাশনাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ‘কাউবয় কার্টার ট্যুর’ এ শুধু টিকিট বিক্রি থেকেই আয় হয় ৪০০ মিলিয়নের বেশি ডলার। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কনসার্টে বিক্রি হওয়া পণ্যসামগ্রী থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার।
ফোর্বস জানায়, পার্কউড অধিকাংশ প্রজেক্টে প্রযোজনার বড় অংশের খরচ নিজেই বহন করে। এর ফলে লাভের বড় অংশ শিল্পীর হাতেই থাকে। যেখানে অনেক শিল্পী রেকর্ড লেবেল বা প্রোমোটারের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বিয়ন্সে নিজের কাজের মালিকানা ধরে রেখে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। এই কৌশলই তাঁকে অন্যদের তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। সিনেমা, স্ট্রিমিং ও বিশেষ পারফরম্যান্সসংগীতের বাইরেও বিয়ন্সের আয়ের উৎস বহুমুখী।
২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া তথ্যচিত্র ‘হোমকামিং : অ্যা ফিল্ম বাই বিয়ন্সে’ এর জন্য নেটফ্লিক্স থেকে আনুমানিক ৬০ মিলিয়ন ডলার পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন। যা সে সময় স্ট্রিমিং ইতিহাসে অন্যতম বড় চুক্তি ছিল। এছাড়াও ২০২৪ সালে নেটফ্লিক্সের ‘ক্রিসমাস ডে এনএফএল’ ম্যাচের হাফটাইম শোতে পারফর্ম করে তিনি পান আরও ৫০ মিলিয়ন ডলার। এর আগে ‘রেনসার্স ওয়ার্ল্ড ট্যুর’ নিয়ে নির্মিত কনসার্ট ফিল্ম সরাসরি এএমসি থিয়েটার চেইনের মাধ্যমে মুক্তি পায়।
ছবিটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে, যার প্রায় অর্ধেকই যায় বিয়ন্সের ঝুলিতে। এছাড়াও ২০২৫ সালে কনসার্ট ট্যুর, ক্যাটালগ ও ব্র্যান্ড চুক্তি মিলিয়ে বিয়ন্সের মোট আয় ছিল প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন ডলার। এর ফলে তিনি গত বছরের বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া সংগীতশিল্পী নির্বাচিত হন।
বিয়ন্সেকে শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না। তিনি একাধারে শিল্পী, প্রযোজক, উদ্যোক্তা এবং সাংস্কৃতিকব্যাক্তিত্ব। নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতি ও সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান তাঁকে সমসাময়িক পপ সংস্কৃতির অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত করেছে।
বিয়ন্সের বিলিয়নিয়ার হওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের বৃদ্ধি নয়। এটি প্রমাণ করে, সৃজনশীলতা ও ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা একসঙ্গে চলতে পারে। শিল্পী নিজেই হতে পারেন নিজের ব্র্যান্ডের পরিচালক, প্রযোজক ও কৌশলবিদ। ফোর্বসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সম্মিলিত আয় ও বিনিয়োগই বিয়ন্সেকে পৌঁছে দিয়েছে এক বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে। বিয়ন্সে এখন আর শুধু একজন পপ তারকা নন। তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক বিনোদন শিল্পের এক শক্তিশালী অধ্যায়।
এমআই/এসএন