ঐক্যের সরকার গঠনে প্রস্তুত জামায়াত: ডা. শফিকুর রহমান

আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের পর সম্ভাব্য ঐক্যের সরকারে জামায়াতে ইসলামী যোগ দিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দেশকে অন্তত পাঁচ বছর স্থিতিশীল রাখতে দলগুলো একসঙ্গে সরকার গঠনে রাজি হলে জামায়াত তাতে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। জামায়াত এরই মধ্যে কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা করেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

নির্বাচনের আগে সম্প্রতি বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যায়, প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় প্রথম নির্বাচনে বিএনপির কাছাকাছি দ্বিতীয় স্থানে থাকবে জামায়াতে ইসলামী।

এতে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মুসলিম জনসংখ্যার এই দেশে দলটির মূলধারার রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে ছিল জামায়াত।

ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা অন্তত পাঁচ বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল দেশ চাই। দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে আমরা একসঙ্গেই সরকার পরিচালনা করব।’ 

জামায়াতের আমির ঢাকার একটি আবাসিক এলাকায় তাঁর অফিসে রয়টার্সকে ওই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। জেন-জিদের একটি দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করে দলটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়ার কয়েক দিন পর এই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি।

জামায়াত শরিয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দলটি রক্ষণশীলতা থেকে বেরিয়ে নিজেদের আহ্বানের ক্ষেত্র বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। শফিকুর রহমান বলেন, যেকোনো ঐক্যের সরকারের জন্য দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচি অবশ্যই একটি অভিন্ন লক্ষ্য হতে হবে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি আসন জয়ী দল থেকেই প্রধানমন্ত্রী হবেন। যদি জামায়াত সবচেয়ে বেশি আসন জিততে পারে, তাহলে তিনি প্রার্থী হবেন কি না, সেটি দলই সিদ্ধান্ত নেবে।

গত বছরের আগস্টে তরুণদের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জামায়াতের রাজনৈতিক পুনরুত্থান ঘটে। আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষমতায় থাকাকালে জামায়াতে ইসলামীর কট্টর সমালোচক ছিলেন হাসিনা।

তাঁর শাসনামলে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।

জামায়াতের সনদ দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান লঙ্ঘন করেছে বলে ২০১৩ সালে আদালত এক রায় দেওয়ার পর থেকে দলটিকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

শফিকুর রহমান বলেন, ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ভারত শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলেছিল; যা দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ব্যবসা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে সহায়তা করেছিল।

বাংলাদেশে পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারে নয়াদিল্লি এমন সব দলের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। দিল্লির এই তৎপরতার মাঝেই চলতি বছরের শুরুর দিকে জামায়াতের আমির ভারতীয় একজন কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অন্য দেশের কূটনীতিকরা যেখানে প্রকাশ্যেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, সেখানে ওই ভারতীয় কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার সঙ্গে এবং নিজেদের মধ্যেও উন্মুক্ত সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।’ ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে ভারত সরকারের একটি সূত্র বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে জামায়াতের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে জানতে চাইলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখি। আমরা কখনোই কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকতে আগ্রহী নই। বরং আমরা সবাইকে সম্মান করি এবং দেশগুলোর মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চাই।’ তিনি বলেন, জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো সরকারই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে ‘স্বস্তিবোধ করবে না’। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সাহাবুদ্দিন। দেশের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান সাহাবুদ্দিন নিজেও চলতি মাসের শুরুর দিকে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মেয়াদের মাঝপথে পদত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন তিনি। তবে বুধবার রয়টার্সের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে জামায়াত আমিরের ওই অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

 আরপি/এসএন




Share this news on:

সর্বশেষ

img
নির্বাচনে দেশের পক্ষের শক্তি বিএনপিকে বিজয়ী করবে: মির্জা ফখরুল Jan 01, 2026
img
বিমান বাংলাদেশের আর্থিক সাফল্য, নিট মুনাফা ৭৮৫ কোটি Jan 01, 2026
img
মানুষের প্রত্যাশা এখন আরও উচ্চতায়, পূরণ করতে পারবো কি না শঙ্কিত: সালাহউদ্দিন Jan 01, 2026
img
ভোলা-২ আসনে দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল Jan 01, 2026
img
চীন-তাইওয়ান ‘পুনর্মিলন অনিবার্য’: শি জিনপিং Jan 01, 2026
img
ধর্মেন্দ্রর ‘ইক্কিশ’ মুক্তি ঘিরে অমিতাভের বিশেষ আয়োজন Jan 01, 2026
img
২০২৬-এ একটাই আশা, কপালের টিপটা যাতে ঠিকঠাক পরতে পারি: সুমি Jan 01, 2026
img
দ্বিতীয় বিচ্ছেদের পর প্রথম সন্তানকে নিয়ে সালমার আবেগঘন পোস্ট Jan 01, 2026
img
মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের তর্ক করা সব সময় খারাপ নয়: কাজল Jan 01, 2026
img
নতুন বছরে ভক্তদের সুখবর দিলেন অধরা খান Jan 01, 2026
img

পটুয়াখালী-৩ আসন

নুরসহ পাঁচজনের মনোনয়নপত্র বৈধ Jan 01, 2026
img
ডা. তাহেরের চেয়ে তার স্ত্রীর সম্পদ ৫ গুণ বেশি! Jan 01, 2026
img
নতুন প্রধান বিচারপতির সংবর্ধনা ৪ জানুয়ারি Jan 01, 2026
img
বছরের প্রথম দিনেই প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা শতভাগ বই পেয়েছে: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা Jan 01, 2026
img
পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী আজ Jan 01, 2026
img
থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি নিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ ও আজহারীর মন্তব্য Jan 01, 2026
img
মির্জা ফখরুলের বছরে আয় ১১ লাখ Jan 01, 2026
img
টস জিতে ফিল্ডিংয়ে ঢাকা ক্যাপিটালস Jan 01, 2026
img
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত Jan 01, 2026
img
খালেদা জিয়ার আসনে বিকল্পরাই দলের প্রার্থী: সালাহউদ্দিন আহমেদ Jan 01, 2026