রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব বলেছেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা করিনি, কারণ আমাদের ভেতর শিক্ষার অভাব রয়েছে। আমরা শিক্ষা নিয়ে কথা বললে দেখতে পাই বিশ্ববিদ্যালয়ে কি ধরনের জ্ঞান অর্জন বিতরণ ও সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে আর একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে, শিক্ষা একটা মস্ত বড় ব্যবসা। পৃথিবীতে যতগুলো ব্যবসা রয়েছে তার মধ্যে শিক্ষা হলো একটা বড় ব্যবসা। আসলে শিক্ষার একটা বড় উদ্দেশ্য হলো মার্কেটের জন্য স্কিল্ড ম্যান পাওয়ার সাপ্লাই করা।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকী উপলক্ষ্যে 'বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও জুলাই ২৪ পরবর্তী ভাবনা' শীর্ষক সেমিনারের প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
ড. সালেহ হাসান নকীব বলেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য চিন্তা, ক্ষমতা এবং সচেতনতা। কিন্তু এইটা যখন তৈরি হয় না তখন শিক্ষার কাছে আমাদের যে প্রত্যাশা সেটা পুরণ হয় না। সচেতনতার মানে হচ্ছে যুক্তি বোধ তৈরি হওয়া, কিন্তু আমরা শিক্ষাকে দেখি স্ট্রেমলি লো কোয়ালিটির চশমা পড়ে। এই চশমা দিয়ে কোনো কাজ হবে না আমি জানি। কেন এগুলো বলছি কোনো কিছু উপলব্ধি করার সক্ষমতা আমাদের হয়নি কিন্তু আমরা বয়ান ঝাড়তে উস্তাদ।
তিনি বলেন, উদারতা ছাড়া শিক্ষার কোনো অস্তিত্ব নেই। শিক্ষাকে ডায়নামিক হতেই হবে, অরগ্যানিক ডেভেলপমেন্টের ওপর জোড় দিতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী শিক্ষার যে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল সেটা পরিলক্ষিত হয়নি বরং পুরাতন ভুত ফিরে আসার জন্য রেডি হয়ে আছে। চাঁদ ওঠার আগেই ঈদ শুরু হয়ে গেছে, এই খেলায় আর দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণ করবেন না। যদি দেশের প্রতি দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে থাকে তাহলে মিটি মিটি হেসে এই দায়বদ্ধতা থেকে আপনি মুক্তি পাবেন না এবং ধান্দাবাজি, শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতি ছাড়তে হবে। এগুলো করে শিক্ষার উন্নয়ন হবে না, জুলাই-পরবর্তী কিছু তো পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু মূল পরিবর্তন সাধিত হয়নি।
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বলেন, আমরা জুলাই পূর্ববর্তী সময়ে দেখেছি ক্যাম্পাসগুলোর কি অবস্থা ছিল। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করাই ছিল মুখ্য। আমরা দেখেছি, পদ্মা সেতু উদ্বোধন নিয়ে যে গনকালেকশন করা হয়েছিলো, সেই গনকালেকশনের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে একজন ছাত্রকে খুন করা হয়েছে। এসএম হলে ফিস্টের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ছাত্র খুন হয়েছে। আমরা দেখেছি, চবি-জাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কীভাবে প্রকল্পের টাকার ভাগ ছাত্রলীগকে দিয়েছিল। এমনকি জাবির তৎকালীন ভিসি স্বীকারও করেছিলেন আমি ১৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ২ কোটি টাকা ছাত্রলীগকে দিয়েছি। আমরা দেখেছি ঢাকায় বসে টাকা রিসিভ করে রাজশাহীতে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে এসে সেই ১৬ বছরের স্বৈরাচার ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। আমাদের প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যের অবসান, অন্যায়ের বিচার এবং একটা ইনসাফপূর্ণ সমাজ বাস্তবায়নের। একটা বিপ্লবী জাতির সঙ্গে ব্যাপক সংস্কার করার কথা ছিল, বিচার বিভাগ, শিক্ষা সংস্কার হওয়ার কথা ছিল, সমাজে যে জুলুম ছিল এগুলো ঠিক হওয়ার কথা ছিল। প্রফেসর ইউনূস স্যারকে সবাই সম্মান দিয়ে নিয়ে এসেছেন তিনিও চেয়েছিলেন উল্লেখযোগ্য সংস্কার করে যেতে। কিন্তু বিভিন্ন স্বার্থের কারণে বিপ্লবের সাথীরা অনেক দূরে সরে গিয়েছে ততই সংস্কার পিছিয়ে পড়ে গিয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহা. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো নিজেকে জানা, জানার মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তন করা এবং সমাজকে পরিবর্তন করা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল কারিগর ছিল আমাদের শিক্ষার্থীরা। তাদের জন্য এই সমাজ ও রাষ্ট্র কি করছে সেটা ভাবতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা কি ছিল আর কি পরিবর্তন হলো। শিক্ষা নিয়ে আমাদের গুরুত্ব কতখানি, আগ্রহ কতখানি সেটা যদি চব্বিশের মূল সুর হতো তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারতাম চব্বিশ-পরবর্তী এই ভাবনাটাই মূল শক্তি হতো। আমাদের দ্বারা সেটা হয়নি। এই নতুন বাংলাদেশে শিক্ষার যেই বাজেট হওয়ার কথা ছিল সেটা সরকার পুরোপুরি করতে পারেনি।
এসকে/টিএ