ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে পাওয়া একটি হাতে আঁকা স্টেনসিল বা গ্রাফিতিই এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো গুহাচিত্র বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। লাল রঙে আঁকা এই হাতের অবয়বটির বয়স কমপক্ষে ৬৭ হাজার ৮০০ বছর। এটি এত দিন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরনো বলে বিবেচিত স্পেনের একটি ‘বিতর্কিত’ গুহাচিত্রের চেয়েও প্রায় ১ হাজার ১০০ বছর পুরনো।
গবেষকেরা বলছেন, শুধু হাতের ছাপ নয়, এই চিত্রে মানুষের কল্পনাশক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মিলেছে।
প্রথমে হাতের স্টেনসিল তৈরি করার পর আঙুলগুলোর রেখা বদলে দেওয়া হয়েছে চিত্রকর্মে, যাকে সংকীর্ণ ও লম্বা করে এক ধরনের নখরসদৃশ রূপ দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি নিছক অনুকরণ নয়, বরং প্রতীকী ও সৃজনশীল চিন্তার প্রকাশ।
এই আবিষ্কারটি প্রভাবশালী বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় যুক্ত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাডাম ব্রুম।
তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘এটি দেখায় যে মানুষের সৃজনশীলতা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে হঠাৎ জেগে ওঠেনি। বরং এই ক্ষমতা আমাদের প্রজাতির ভেতরেই ছিল।’
দীর্ঘদিন ধরে প্রত্নতত্ত্বে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল, মানুষের শিল্প ও প্রতীকী চিন্তার ‘বিস্ফোরণ’ প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে ইউরোপে ঘটেছিল। ফ্রান্স ও স্পেনের গুহাচিত্রগুলো সেই ধারণাকে শক্তিশালী করেছিল।
কিন্তু গত এক দশকে সুলাওয়েসিতে পাওয়া একের পর এক প্রাচীন চিত্র সেই ইউরোপকেন্দ্রিক ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
২০১৪ সালে সুলাওয়েসিতে অন্তত ৪০ হাজার বছর পুরনো হাতের ছাপ ও পশুচিত্র আবিষ্কৃত হয়। এরপর ৪৪ হাজার বছর পুরনো শিকারের দৃশ্য, ৫১ হাজার ২০০ বছর আগের মানুষ ও শূকরের বর্ণনামূলক চিত্র পাওয়া যায়। প্রতিটি আবিষ্কার মানব শিল্পকলার সময়রেখাকে আরো পেছনে ঠেলে দেয়।
এবার সবচেয়ে প্রাচীন এই চিত্রটি পাওয়া গেছে সুলাওয়েসির দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ছোট দ্বীপ মুনার লিয়াং মেটানদুনো নামের একটি চুনাপাথরের গুহায়।
এখানে একজন প্রাগৈতিহাসিক শিল্পী গুহার দেয়ালে হাত চেপে ধরে মুখ দিয়ে রং ছিটিয়ে স্টেনসিল তৈরি করেছিলেন। আধুনিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘গ্রাফিতি’।
এই হাতের স্টেনসিলের ওপর জমে থাকা খনিজ স্তর বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করেছেন ৬৭ হাজার ৮০০ বছর। ফলে এটি এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে তারিখ নির্ধারিত গুহাচিত্র।
সুলাওয়েসি এশিয়া থেকে প্রাচীন অস্ট্রেলিয়া-নিউগিনি ভূখণ্ড (সাহুল) যাওয়ার উত্তরের সমুদ্রপথে অবস্থিত। তাই এই আবিষ্কার অস্ট্রেলিয়ায় মানুষের আগমনের সময় নিয়েও নতুন আলো ফেলছে।
এত দিন অনেক গবেষকের ধারণা ছিল, মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছে প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে। কিন্তু সুলাওয়েসিতে এত পুরোনো ও জটিল শিল্পকলার প্রমাণ করে অস্ট্রেলিয়ায় মানুষের উপস্থিতি ৬৫ হাজার বছর আগের বিতর্কিত প্রমাণগুলোকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থা ব্রিনের গবেষক অধি আগুস অক্টাভিয়ানা বলেন, ‘খুব সম্ভবত সুলাওয়েসির এই শিল্পীরাই সেই বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর অংশ ছিলেন, যারা পরে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছেন।’
লিয়াং মেটানদুনো গুহায় একই দেয়ালে ২০ হাজার বছর আগের তুলনামূলক নতুন চিত্রও রয়েছে। অর্থাৎ, অন্তত ৩৫ হাজার বছর ধরে এই গুহাটি শিল্পচর্চার কেন্দ্র ছিল। গবেষকেরা বলছেন, এটি প্রমাণ করে যে গুহাচিত্র আঁকা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এই অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতিতে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
টিকে/