বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই আলাদা করে মাথা নত করতে হয়, সেই ‘নায়করাজ’ আব্দুর রাজ্জাকের আজ ৮৪তম জন্মদিন। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তি ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও তাঁর উপস্থিতি আজও দর্শকের স্মৃতিতে, অনুভবে ও ভালোবাসায় অমলিন হয়ে আছে।
জীবনের শুরুটা মোটেও রূপালি পর্দার ঝলমলে আলোয় মোড়া ছিল না। ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিলের সেই অস্থির সময়, যখন চারদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন। টালিগঞ্জে তখন উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর বিশ্বজিৎদের দাপট। সেখানে নিজের জায়গা করে নেওয়ার লড়াই ছিল প্রায় অসম্ভব। এমনই এক বাস্তবতায় এক শুভানুধ্যায়ের পরামর্শে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে কলকাতা ছেড়ে শরণার্থী হয়ে ঢাকায় আসেন রাজ্জাক। শুরু হয় নতুন জীবনের আরেক অধ্যায়, এক অচেনা শহরে নিজেকে প্রমাণ করার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম।
ঢাকায় এসে ফার্মগেট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় সংসার পাতেন তিনি। তখন চলচ্চিত্র তো দূরের কথা, নিয়মিত আয়ের একমাত্র ভরসা ছিল টেলিভিশন নাটক। সেই সময়ের কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে এক সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক বলেছিলেন, একটি সাপ্তাহিক নাটকই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। সপ্তাহে মাত্র পঁয়ষট্টি টাকা পারিশ্রমিকে পরিবার চালানো ছিল দুঃসহ, তবুও সেই সীমিত আয় দিয়েই দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটিয়েছেন তিনি, অদম্য মনোবল আর স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে।
কৈশোরে মঞ্চনাটকের মাধ্যমে অভিনয়ের হাতেখড়ি হলেও সময়ের স্রোতে রাজ্জাক হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত নায়ক। জহির রায়হানের পরিচালনায় ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর একের পর এক দর্শকপ্রিয় ও কালজয়ী ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘নায়করাজ’ হিসেবে। অভিনয়ই ছিল তাঁর জীবন, তাঁর সাধনা, তাঁর পরিচয়।
রাষ্ট্রীয় পুরস্কার থেকে শুরু করে অসংখ্য সম্মাননা তাঁর ঝুলিতে এলেও রাজ্জাকের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। আজ তাঁর জন্মদিনে তাই শুধু একজন অভিনেতাকেই নয়, স্মরণ করা হয় এক সংগ্রামী মানুষকে, যিনি সীমাহীন প্রতিকূলতা পেরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের চিরন্তন নায়করাজ।
এসকে/টিকে