চলতি মাসের শুরুর দিকে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসে মার্কিন বাহিনী। এতে দেশটির ওপর নিজের খবরদারি প্রতিষ্ঠা পেলেও স্বস্তিতে নেই ওয়াশিংটন। নতুন আরেক শত্রুর দিকে এবার নজর পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের। সেই শত্রু আর কেউ নয় চীন।
ভেনেজুয়েলা সরকারের দীর্ঘদিনের মিত্র চীন, বছরের পর বছর দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে তেল ও অবকাঠামোখাতে বিনিয়োগ করে এসেছে। মাদুরোকে উৎখাতের পর দুই দেশের সেই বন্ধুত্বে ছেদে পড়েছে। এতে ভেনেজুয়েলায় চীন যে বিনিয়োগ করেছে, সেই টাকা আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
যদিও বেইজিংয়ের চোখ দিয়ে দেখলে, এর চেয়েও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। সফল এক অভিযানের পর ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর অবশ্য আরেকটি আশা উঁকি দিচ্ছে। পুরো লাতিন আমেরিকা থেকেই এখন চীনের প্রভাব কমাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। অথচ দশকের পর দশক এই অঞ্চলে টাকা ঢেলেছে চীন। বাড়িয়েছে বাণিজ্যিক সম্পর্ক।
এর পেছনে লাতিন আমেরিকায় নিজের প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবহন লিংক জোরদার ও জ্বালানি খরচ কমানোও উদ্দেশ্য ছিল চীনের। গেল মাসে মার্কিন সরকার তাদের একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করে। সেখানে পশ্চিম গোলার্ধে অন্যদের প্রভাব কমিয়ে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলা হয়।
হোয়াইট হাউজে চলতি মাসের শুরুর দিকে তেল ব্যবসায়ীদের ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় ওয়াশিংটনের অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা এটা না করলে চীন ও রাশিয়া, সেখানে এই কাজটা করত। কিন্তু এখন সেখানে তারা যেতে পারবে না।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের এভাবে মাঠের বাইরে রাখার ওয়াশিংটনের এই দৃঢ়তাকে তথকথিত ডনরো মতবাদ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। মূলত ১৮২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিকে পশ্চিম গোলার্ধে ওয়াশিংটনের প্রভাবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে সতর্ক করেছিলেন। এখন সেই বক্তব্যকে চয়ন করলেন ট্রাম্প নিজেও!
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ওয়াশিংটন তার স্বার্থ আদায়ে অন্য দেশগুলোকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে শক্তি প্রয়োগ নাকি শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞার মতো কৌশল বেছে নেবে। তবে ইতোমধ্যেই যে ওয়াশিংটনের চাপ রয়েছে, তা স্বীকারও করছেন অনেকে। চীনে চিলির সাবেক রাষ্ট্রদূত জর্জ হেইন বলেন, কোনো সন্দেহ নেই চাপ আছে। দেশগুলো এখন ঝুঁকিতে আছে।
এটা কিভাবে সামাল দেওয়া যায়, তার উপায় খুঁজছে বিভিন্ন দেশ।
মার্কিন চাপে যে বিভিন্ন দেশের সরকার চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা বা বিদ্যমান সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে পারে, এটা ভালোভাবেই জানে বেইজিং। সেই নমুনাও এরই মধ্যে সামনে এসেছে। পানামা খালের পরিচালনায় থাকা হংকংয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিলে বৃহস্পতিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির হাইকোর্ট। আদালত বলেন, ওই চুক্তি অসাংবিধানিক ছিল।
বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির ফেলো সান চেংহাও বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে অবকাঠামো, সাপ্লাই চেইন এবং কৌশলগত সম্পদকে নিরাপত্তার আওতায় আনার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের যে ঝোঁক, তা লাতিন আমেরিকায় চীনের সম্পৃক্ততার রাজনৈতিক মূল্য অবশ্যই বাড়িয়ে দেবে।
তবে এটাও স্পষ্ট যে পিছপা হবে না বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। বেইজিংও দেখতে চায়, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতি চীনের প্রভাবকে টক্কর দেবে নাকি আরও দেশকে চীনমুখী করে তুলবে।
পিএ/টিকে