বিএনপির এই নেতা বলেন, জামায়াত আমির সম্প্রতি নারীদের নিয়ে যে বিতর্কিত ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, যা দেশজুড়ে নারীদের ক্ষুব্ধ করেছে—সেই ইস্যু থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণার বিতর্ক সামনে এনেছেন।
জামায়াতে ইসলামের তীব্র সমালোচনা করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দলটি যদি এভাবে ইতিহাস বিকৃতি চালিয়ে যায়, তবে একদিন হয়তো তারা দাবি করে বসবে যে গোলাম আজমই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) শবে বরাত উপলক্ষে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, "যখন পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের মা-বোনদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, আপনারা (জামায়াত) সেটিকে নিপীড়ন বলেননি। আপনারা এমনকি ওই বর্বরতাকে অপরাধ হিসেবেও স্বীকার করেননি। উল্টো আপনারা তাদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।"
চট্টগ্রামে গত সোমবার রাতে এক নির্বাচনি জনসভায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় রিজভী বলেন, "আর কয়েকদিন পর আপনারা হয়ত বলবেন গোলাম আজম নিজেই স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন। আপনারা সেটিও বলতে পারেন, কারণ আপনারা মিথ্যা বলতে কখনো পিছিয়ে থাকেন না।"
বিএনপির এই নেতা বলেন, জামায়াত আমির সম্প্রতি নারীদের নিয়ে যে বিতর্কিত ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, যা দেশজুড়ে নারীদের ক্ষুব্ধ করেছে- সেই ইস্যু থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণার বিতর্ক সামনে এনেছেন।
এর আগে সোমবার রাতে চট্টগ্রামের বন্দর স্কুল মাঠে এক জনসভায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রাম থেকেই হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "আপনারই এক গর্বিত সন্তান প্রথম হুংকার দিয়েছিলেন 'উই রিভোল্ট' (আমরা বিদ্রোহ করলাম)—তিনি হলেন এলডিপির সম্মানিত প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম। তিনিই জিয়াউর রহমানের হাত ধরে তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের মানুষ আপনাদের স্যালুট জানাই, আপনারা এই গর্বিত ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন।"
জামায়াত আমিরের এই বক্তব্যের জবাবে রিজভী বলেন, একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে সত্যকে আড়াল করা যাবে না। তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই ছিলেন স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক। "একজন মেজর হিসেবে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। এমনকি জিয়ার সঙ্গে যারা কাজ করেছেন তারাও তাঁদের লেখনীতে এই ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন।"
রিজভী প্রশ্ন তোলেন, হীন রাজনৈতিক স্বার্থে দেওয়া এ ধরনের হুটহাট দাবি কি মানুষ গ্রহণ করবে? তিনি বলেন, অলি আহমদ তার সামরিক বা পেশাগত জীবনের কোনো পর্যায়েই নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দাবি করেননি। এমনকি জিয়াউর রহমান যখন দল গঠন করেন, অলি তার সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন এবং এসব তথ্য তার নিজের প্রকাশিত বইয়েও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
জামায়াতের অতীত ভূমিকা টেনে রিজভী বলেন, ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচনের সময় জামায়াত নির্বাচনে না যাওয়ার ওয়াদা ভঙ্গ করেছিল। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া সেই নির্বাচনে অংশ নেননি। তিনি বছরের পর বছর দমন-পীড়ন ও গৃহবন্দিত্ব সহ্য করেছেন কিন্তু তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি আরও বলেন, নারীদের নিয়ে বক্তব্যের মাধ্যমেই জামায়াতের 'আসল চরিত্র' এখন উন্মোচিত হচ্ছে।
নারীদের মর্যাদা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ইসলাম নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকর মন্তব্য দেশজুড়ে গণরোষ তৈরি করেছে। "স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে মিথ্যা বিতর্ক তুলে এই জনক্ষোভ ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।"
শবে বরাতের তাৎপর্য তুলে ধরে বিএনপি নেতা বলেন, এই পবিত্র রাত আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অনুপ্রেরণা দেয়। মানুষ যখন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যায়, তখন সমাজে অবক্ষয় বাড়ে। তিনি ধর্মকে রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইসলাম কোনো পণ্য নয় বরং এটি এ দেশের মুসলমানদের জীবনবিধান।
এসকে/এসএন