নির্বাচনী ইশতেহারে ৩৭ দফা স্বাস্থ্য পরিকল্পনা

ঢাকায় চাপ কমাতে জেলা-উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল করবে জামায়াতে ইসলামী

স্বাস্থ্যসেবাকে সবার অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ৩৭ দফা স্বাস্থ্য পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে বিনামূল্যে চিকিৎসা, জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল শেরাটনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামী।

নির্বাচনী ইশতেহারে জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা জনগণের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা বদলাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দলটির মতে, এতে রাজধানীকেন্দ্রিক চাপ কমবে, রোগীর ভোগান্তি ও চিকিৎসা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

ইশতেহারে বলা হয়, পাঁচ বছরের নিচে শিশু এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে সব নাগরিককে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ধাপে ধাপে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য ডিজিটাল হেলথ কার্ড প্রবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দেশের সব পর্যায়ের মানুষ সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসে।

সরকারি হাসপাতালগুলোর বর্তমান সেবার মান প্রথম ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে শতভাগ সক্ষমতায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার সংস্কার, যন্ত্রপাতির দ্রুত মেরামত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।

স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট মোকাবিলায় চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ সব স্তরের শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগের অঙ্গীকার করেছে জামায়াত। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে তিনগুণ বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক-রোগী অনুপাত নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতিটি জেলা হাসপাতালে কমপক্ষে পাঁচ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার, আইসিইউ ও সিসিইউ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে জেলা ও উপজেলায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।

গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে রেজিস্টার্ড স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। শহর এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ডে নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা জিপি সেন্টার কার্যকর করার পাশাপাশি টেলিমেডিসিন ও রেফারেল সিস্টেম চালুর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা সহজ করার কথা জানানো হয়।

স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালসহ সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের আর্থিক আয়-ব্যয়ের হিসাব পাবলিক ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি চালুর প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে কমিশন বাণিজ্য ও অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধে আইন ও কঠোর মনিটরিংয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়।

ইশতেহারে নারী ও শিশুর চিকিৎসায় অগ্রাধিকার, প্রবীণদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের হোমকেয়ার, রিহ্যাবিলিটেশন ও প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ব্যবস্থা রাখার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রবাসীদের জন্য দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা সহজীকরণের কথাও উল্লেখ করা হয়।

মানহীন হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মেডিকেল কলেজগুলোর মানোন্নয়ন, বিএমইউ সুপার-স্পেশালাইজড হাসপাতাল দ্রুত চালু এবং চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণাকে রাজনীতিমুক্ত করার প্রস্তাবও ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সেবার মান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

এ ছাড়া অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রিত ও ন্যায্য মূল্যে সরবরাহ, জরুরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার, ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা বাণিজ্যের পণ্য নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যখাতকে জনগণের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনাই তাদের লক্ষ্য।

এমআর/টিকে 

Share this news on:

সর্বশেষ

img
আমিরের আইডি হ্যাক, ছরওয়ারের বিরুদ্ধে মামলা করছে জামায়াত Feb 04, 2026
img
সম্পর্কের গুঞ্জনে মুখ খুললেন শিল্পার বোন শমিতা শেঠি! Feb 04, 2026
img
আমি প্রথম বিদ্রোহ করেছি, জামায়াত আমিরের বক্তব্য ঠিক আছে : কর্নেল অলি Feb 04, 2026
img
স্মৃতি-পলাশের বিবাহবাসরে গিয়ে কী দেখেন নন্দিশ? Feb 04, 2026
কারিনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, নেটিজেনদের কটাক্ষ Feb 04, 2026
img
আমরা সন্ত্রাসের রাজনীতি পেছনে রেখে আসছি: হান্নান মাসউদ Feb 04, 2026
img
সুষ্ঠু ভোট হলে তারেক রহমান হবেন প্রধানমন্ত্রী: শামা ওবায়েদ Feb 04, 2026
img
‘মিটু’ নিয়ে কথা হলে ‘পিডোফেলিয়া’ নিয়ে নয় কেন? Feb 04, 2026
img
'এপস্টেইন ফাইল'-এ বিল গেটসের নাম নিয়ে মুখ খুললেন সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা Feb 04, 2026
img
সাতক্ষীরায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার Feb 04, 2026
img
কাজের অভাবে বিকল্প পথ খুঁজছেন প্রান্তিক ব্যানার্জি! Feb 04, 2026
img
জামায়াত ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দেবে : মিন্টু Feb 04, 2026
img
যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তারা দেশপ্রেম শেখাচ্ছে: ডা. জাহিদ Feb 04, 2026
img

নির্বাচনী ইশতেহার

গ্রামীণ নারীদের জন্য ‘আমার আয়ের সংসার’ প্রকল্পের ঘোষণা জামায়াতের Feb 04, 2026
img
৩০ ভাগ মানুষ মার্কা নয়, প্রার্থী দেখে ভোট দেবে : রুমিন ফারহানা Feb 04, 2026
img
মোদিকে ঘিরে নজিরবিহীন হট্টগোল, সংসদে বিরোধী নেতাদের তুমুল বিক্ষোভ Feb 04, 2026
img
১৫ বছর আমাদের ওপর এতো জুলুম হওয়ার পরেও আমরা ছেড়ে যাইনি : জামায়াত আমির Feb 04, 2026
img
নির্বাচনী সফরে ফের উত্তরবঙ্গে যাচ্ছেন তারেক রহমান Feb 04, 2026
img
সরকারে এলে পাহাড়ি-বাঙালি রেষারেষি বন্ধ করবো : জামায়াত আমির Feb 04, 2026
img
পুতিনের সঙ্গে ভিডিও কল, অতঃপর ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপ শির Feb 04, 2026