আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ নম্বর খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের ২০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টিই ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্রকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলা পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো তালিকা থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
দুর্গমতার কারণে দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের সীমান্ত জনপদ নাড়াইছড়ি এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নের ফুত্যাছড়ি ও শুকনাছড়ি কেন্দ্রে ভোটের সামগ্রী ও জনবল হেলিকপ্টারে পাঠানো হবে।
সব কটি কেন্দ্রকে দূরত্ব, ভোটারদের অবস্থান, প্রার্থীদের প্রভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে মাত্র ১৪টি কেন্দ্র। বাকি ১২১টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬৮টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তালিকায় দেখা গেছে, ৬৮টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৬টি কেন্দ্র খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায়। এরপর রামগড়ে ১১টি, গুইমারায় ১০টি, মানিকছড়িতে ৯টি, মহালছড়িতে ৮টি, মাটিরাঙায় ৫টি, দীঘিনালায় ৪টি, পানছড়িতে ৩টি এবং লক্ষ্মীছড়িতে ২টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের মোট ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন (পুরুষ ২ লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন এবং নারী ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৪ জন)। এর মধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৬৮টি কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬২৬ জন।
উপজেলাওয়ারি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা: সদর উপজেলার ১৬ কেন্দ্রে ৪০ হাজার ৪৮৬ জন, রামগড় উপজেলার ১১ কেন্দ্রে ২৭ হাজার ৭৩১ জন, গুইমারা উপজেলার ১০ কেন্দ্রে ২৭ হাজার ২৬৪ জন, মানিকছড়ি উপজেলার ৯ কেন্দ্রে ২৩ হাজার ৩৮২ জন, মহালছড়ি উপজেলার ৮ কেন্দ্রে ২০ হাজার ৫৩৪ জন, মাটিরাঙা উপজেলার ৫ কেন্দ্রে ১৩ হাজার ৬৯৯ জন, দীঘিনালা উপজেলার ৪ কেন্দ্রে ১১ হাজার ১৮ জন, পানছড়ি উপজেলার ৩ কেন্দ্রে ৬ হাজার ৬৫৩ জন এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার ২ কেন্দ্রে ২ হাজার ২৩৮ জন।
দীঘিনালা উপজেলার ৪টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে বাবুছড়াতেই রয়েছে ৩টি। এই ইউনিয়নের নুনছড়ি কেন্দ্রের ভোটার ও ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অলকেশ চাকমা বলেন, ‘খাগড়াছড়ির মধ্যে সমতল এলাকাগুলোতে তুলনামূলকভাবে ভোটকেন্দ্র বেশি। আর পাহাড়বেষ্টিত এলাকার বাসিন্দারা বসবাস করেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। জীবন ও জীবিকার এই বাস্তবতা নির্বাচন কমিশন কখনো ভেবে দেখেনি।’ এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গগন বিকাশ চাকমাও একই ধরনের মত ব্যক্ত করেছেন।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া, পেরাছড়া এবং খাগড়াছড়ি ইউনিয়নের সব কটি ভোটকেন্দ্রই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। গোলাবাড়ি ইউনিয়নের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে মাত্র তিনটি ভোটকেন্দ্র। ভোট দিতে আসতেই দিন শেষে সন্ধ্যা নামে। এই ইউনিয়নে কমপক্ষে আরও তিনটি ভোটকেন্দ্র করা গেলে ভোটারদের সুবিধা হতো।
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নটি সড়ক যোগাযোগের দিক থেকে উপজেলা সদরের সঙ্গে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এই ইউনিয়নের বাসিন্দারা ফটিকছড়ির খিরাম-নানুপুর-নাজিরহাট-বিবিরহাট হয়ে আসা-যাওয়া করেন। সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও ভোটার নির্মল কান্তি চাকমা জানান, এখানে অনেক বাসিন্দাকে একদিন আগেই ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। তা না হলে দিনে এসে দিনে ভোট দেয়া প্রায় অসম্ভব। অনেক বয়স্ক, প্রতিবন্ধী এবং অসুস্থ ভোটার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে পারেন না।
মাটিরাঙা উপজেলার সাপমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৪টি ওয়ার্ডের ৩৫টি পাড়ার ভোটাররা ভোট দেবেন, যাদের অধিকাংশই আদিবাসী ও হতদরিদ্র। ভোটকেন্দ্রটি থেকে একেকটি পাড়ার দূরত্ব পায়ে হাঁটা পথে কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার। ভোটার সুমি ত্রিপুরা বলেন, ‘আলুটিলা টুরিস্ট এলাকায় একটি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করলে অনেক ভোটারের জন্য সুবিধা হতো।’
রামগড় পৌরসভার ১০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮টিই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। রামগড় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক নিজামউদ্দিন লাভলু বলেন, ‘জনসংখ্যা এবং ভোটারবহুল এলাকা ও সীমান্ত বিবেচনায় এখানে ভোটকেন্দ্রগুলো সব সময়ই নিরাপদ পরিবেশ বজায় থাকে। ভোটকেন্দ্র পর্যাপ্ত থাকার কারণে রামগড় পৌর এলাকায় ভোট পড়ার হারও সব সময় বেশি থাকে।’
পাতাছড়া ইউনিয়নের ৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ২টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। ভোটার নির্মল ত্রিপুরা জানান, ভোটারদের সংখ্যা, বসতি বৈচিত্র্য এবং দূরত্ব বিবেচনায় কেন্দ্র বাড়ানো হলে ঝুঁকিও কমে আসত এবং ভোটারদের সুবিধা হতো।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাবেক সভাপতি ও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর বোধিস্বত্ত দেওয়ান মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূগোল, জনমিতি, বসতি, জীবন-জীবিকা এবং জীবনের মান বিবেচনা করেই সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্র বিন্যাস জরুরি। তিনি বলেন, ‘সমতলের চোখে কেন্দ্র বিভাজন হয় বলে অনেক আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ভোটাররা কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে পড়ে থাকেন। ফলে ওই সব এলাকায় ভোট পড়ার হারও সব সময় কমছে।’ কেন্দ্র বিভাজনের আগে তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রথাগত নেতৃত্বের (হেডম্যান-কার্বারি) সঙ্গে আগাম মতবিনিময়ের ওপর জোর দেন।
খাগড়াছড়ি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এসব কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের সুপারিশ ও প্রস্তাবনা আমরা নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করব। শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের জন্য আমরা সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করব।’
খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার (এসপি) সায়েম মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রার্থীরা যেসব কেন্দ্রে ভোট দেবেন, সেগুলোকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকি। প্রতিটি কেন্দ্রে নির্ধারিত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া যেসব কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, টহল জোরদার এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে।’
এমআই/টিকে