ট্রাম্পের শুল্কনীতি:রফতানি বহুমুখীকরণের নতুন সুযোগ

সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা। কারণ, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসবে। এত দিন দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মোট তৈরি পোশাক রফতানির ১৮ শতাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির কী হবে, সেটি নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে এটাকে সুযোগ হিসেবেই আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন থেকে দেশের রফতানি খাত মূলত তৈরি পোশাককেন্দ্রিক। মুষ্টিমেয় কিছু লোক সুবিধা নিচ্ছে। কর্মসংস্থানের কথা বলা হলেও ধীরে ধীরে নতুন নুতন প্রযুক্তির আর্বিভাবে আগামী দিনে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান কমবে। বিশ্ব পরামক্রমশীল চীনে ২০ বছর আগে পোশাক খাত রফতানি আয়ে শীর্ষে ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে দেশটি অন্যান্য রফতানিতে গুরুত্ব দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত হচ্ছে তবুও এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে খুবই কম। কোনো কারণে পোশাক খাতে বিপর্যয় এলে দেশের জন্য যা বড় ঝুঁকি হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নীতি ও অর্থায়ন বাধা এবং পোশাক বহির্ভূত খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাব রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণকে ধীর করে দিয়েছে। তাই সময় এসেছে অন্যান্য দিকে নজর দেয়ার। বিশেষ করে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে এখনই রফতানি পণ্যের বাজারকে বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যে একাধিক বক্তব্যে জনসংখ্যাকে ‘সমস্যা’ হিসেবে না দেখে সঠিক নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে এটিকে বড় সম্পদ হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তরুণদের চাকরপ্রিার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন।

বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিস্কার এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক উন্নতির ফলে কর্মসংস্থানের ধারণা ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। তাই সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষাই অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে। কিন্তু সঠিকভাবে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে না। তাই কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত লাখ লাখ তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগাতে পোশাক খাতের পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্যবহার করে পোশাকের বাইরে অন্যান্য রফতানি পণ্যে নতুন কিছু করার চিন্তা করতে হবে। ইতোমধ্যে আগামী ৭ এপ্রিল ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে চার দিনব্যাপী বিনিয়োগ সম্মেলন। এ সম্মেলনে স্টারলিংকের ইন্টারনেটের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সরেজমিন তুলে ধরার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি হবে বলেও আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের। অবশ্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘বাংলাদেশে রফতানি বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রফতানি উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড়ের তুলনায় চারগুণ বেশি কেন্দ্রীভূত। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ রফতানি বাজার বহুমুখীকরণের অভাবেও ভুগছে। এডিবির গবেষণাপত্রে রফতানির বিপরীতে নীতি-প্রণোদিত প্রণোদনা মোকাবিলা, রফতানি বাজার বৃদ্ধি ও পণ্যের বহুমুখীকরণ দ্রুত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে রফতানি বহুমুখীকরণের আরেক বাধা পোশাক ও পোশাক-বহির্ভূত খাতের মধ্যে আয়করের হারে পার্থক্য। পোশাক খাত তুলনামূলকভাবে কম করপোরেট কর থেকে উপকৃত হয়েছে। এই করের হার ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত। বিপরীতে বস্ত্র, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং হোম টেক্সটাইলের মতো পোশাক বহির্ভূত খাতগুলো ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দেয়। যদিও ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিষেবা ও পণ্য রফতানির জন্য ১২ শতাংশের অভিন্ন আয়কর হার চালু হয়েছিল। এই উদ্যোগের ফলে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য আয়কর হারে বৈষম্য দূর হওয়ার আশা করা হচ্ছে। অবশ্য বাস্তবে এখনো তার প্রতিফলন নেই।

পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের (পিআরজি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত চার দশক ধরেই বাংলাদেশ রফতানি সাফল্য ধরে রেখেছে। যার অধিকাংশই পোশাক খাত। যে কারণে একদিকে পোশাক খাতের সক্ষমতা বেড়েছে। যা রফতানি খাতে ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। কারণ নির্ভরতা অত্যধিক বেড়েছে। পোশাক খাতে ধস নামলে দেশের জন্য বিপদ। অন্যদিকে পোশক খাতকে অধিক গুরুত্ব বা সুবিধা দিতে গিয়ে অন্যান্য রফতানি খাত অবহেলিত হয়ে পড়েছে। বা অন্যান্য রফতানি পণ্যে দেশের যে সুযোগ আছে তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, দীর্ঘদিন থেকে রফতানি বহুমুখীকরণ নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করে পরবর্তী কৌশল বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নীতিগত সংস্কারের অভাবে দেশের রফতানি খাতে পোশাক বহির্ভূত পণ্যের রফতানির পরিমাণ কমেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পোশাক খাত বাদে অন্য কোনো রফতানি পণ্যের আয় দুই বিলিয়ন ছাড়াচ্ছে না।

পিআরজি চেয়ারম্যান বলেন, লজিস্টিক সাপোর্ট ও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণসহ কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে এসব খাতে সঠিক সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, রফতানিমুখী অন্যান্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আনা জরুরি। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও মার্কেট পরিচিতির মাধ্যমে রফতানি বাগাতে হবে। সর্বোপরি সমন্বিত সংস্কারের অভাব। এ ছাড়া পণ্য বহুমুখী করা খুব কঠিন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেছেন, রফতানি বহুমুখীকরণ সম্প্রসারণে চারটি প্রধান বাধা হলো ,নীতিগত সমস্যা, অর্থায়ন বাধা, অবকাঠামোর অভাব ও পোশাক বহির্ভূত রফতানিকারকদের দুর্বল দরকষাকষির ক্ষমতা। তিনি বলেন, পোশাক ও পোশাক বহির্ভূত পণ্যের রফতানিকারকরা কার্যত একই সুবিধা পাচ্ছেন না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক রফতানিকারকরা বিনাশুল্কে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করতে পারেন। পোশাক বহির্ভূত পণ্যের রফতানিকারকদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক দিতে হয়। তার ভাষ্যÑ পোশাক বহির্ভূত রফতানিকারকরা পোশাক রফতানিকারকদের মতো সহজে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা পান না। রফতানি বৈচিত্র্য ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে এটিও বড় বাধা। একই সঙ্গে অবকাঠামো ও যথাযথ সরকারি সহায়তার অভাবে কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়ছে না।

বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, নানান কারণে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ হয়নি। পোশাক খাতেও বৈচিত্র্য কম। পোশাক খাতে মাত্র চার থেকে পাঁচটি পণ্য রফতানি হয়। বিদেশি ক্রেতারা সুতি কাপড়ের দামের জন্য দর কষাকষির সুযোগ পেয়েছেন। এতে পণ্যের দাম কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। তার পরামর্শ, কৃত্রিম সুতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিপুল বিনিয়োগ ও সার্বিক সহায়তা প্রয়োজন।

ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গ্যাস সংকট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারখানা সুষ্ঠুভাবে চালাতে বাধা দিচ্ছে। দেশে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, অল্প সংখ্যক উদ্যোক্তা রফতানি উন্নয়ন তহবিল ব্যবহার করায় অর্থায়ন আরেকটি সমস্যা।

মোট রফতানি আয়ের শতকরা ৮২ ভাগের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য রফতানি পণ্য হলোÑ হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া, পাট, কৃষি ও প্রকৌশলজাত পণ্য। তবে পোশাকের কারণে অন্যান্য রফতানি খাতের গুরুত্ব দিন দিন কমছে, বাড়ছে পোশাকের আধিপত্য। রফতানি আয়ের বেশির ভাগ আয় অর্জনকারী খাতটি সরকারের কাছ থেকে বহুবিধ সহায়তা পেয়ে আসছে, এর মধ্যে-নগদ প্রণোদনা, বন্ড সুবিধা, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং নীতিগত সহায়তা উল্লেখযোগ্য। তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের কম উৎপাদন ব্যয় এবং বড় ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বিধায় অন্য খাতের উন্নয়ন ও বিকাশের পথে এ খাত বাধার সৃষ্টি করে। আর পোশাকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার মানে হলো দেশের রফতানি পণ্যর সংখ্যা অনেক কম।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কে তৈরি পোশাক রফতানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। তবে চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্ভাবনাও আছে। বাংলাদেশের উচিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো। যেহেতু খুব বেশি পণ্য দেশটি থেকে আসে না, তাই খুব বেশি ক্ষতি হবে না; বরং পাল্টা শুল্ক কমলে তৈরি পোশাকসহ অন্য পণ্যের রফতানি বাড়বে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানি করে পোশাক তৈরি করছি আমরা। সেই পোশাকের বড় অংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য তাদের দেশে রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের পদক্ষেপ নিতে পারে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার।

সূত্র মতে, সত্তরের দশকের শেষার্ধ থেকে একটি রফতানিমুখী খাত হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের (ওভেন শার্ট) প্রথম চালানটি রফতানি হয় ১৯৭৮ সালে। পরবর্তীকালে বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় দ্রুততার সঙ্গে এ শিল্প বিকশিত হয়। ১৯৮১-৮২ সালে মোট রফতানি আয়ে এ খাতের অবদান ছিল মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। আশির দশকের শেষ পর্যায়ে পাট ও

পাটজাত দ্রব্যের আয়কে পেছনে ফেলে পোশাক শিল্প রফতানি আয়ে প্রথম স্থানে অধিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে অন্যান্য রফতানি খাতের প্রতি সরকারের নজর কমে আসে। যে কারণে দিনে দিনে একক রফতানি খাত হিসেবে আধিপত্য বিস্তার করে পোশাক খাত। অবশ্য দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নয়নে বর্তমান সরকার আর্থিক প্রণোদনা, কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পোশাক খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধির কারণে দেশের রফতানি খাতে এর আধিপত্য আছে। তার মতে, পোশাক বহির্ভূত খাতের প্রবৃদ্ধি খুবই ধীর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি কমেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ খুব কম রফতানিমুখী সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পেয়েছে। এটি রফতানি বহুমুখীকরণকে আটকে রাখার অন্যতম কারণ। আরেক কারণ হলোÑ রফতানিকেন্দ্রিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এখনো কাজ শুরু করতে পারেনি। তিনি রফতানিমুখী বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ও যথাযথ ওয়ানস্টপ সার্ভিস নিশ্চিতের পরামর্শ দেন। এটি রফতানি বহুমুখীকরণে সহায়তা করবে। বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব পোশাক বহির্ভূত খাতগুলোর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন তিনি।

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেছেন, নতুন এই ট্যারিফের চাপ সামলাতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুতই কৌশলগত ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। একই সঙ্গে নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলী দর-কষাকষির মাধ্যমে ট্যারিফ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কৌশল ও পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন হলে, বর্তমান এই কঠিন চ্যালেঞ্জই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় সফলতার সূত্রপাত।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যে শুল্কহার

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যভা-ারে দেখা যায়, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৯১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে ২৯ কোটি ডলার। অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পণ্য রয়েছে ২৬২ কোটি ডলারের। এনবিআরের হিসাবে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য আমদানি হওয়া ২৬২ কোটি ডলারের পণ্যের মধ্যে ১৩৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর দিতে হয়নি। যেমনÑ গম, তুলার মতো পণ্যে শুল্ক-কর নেই। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যে গড়ে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রড তৈরির কাঁচামাল- পুরোনো লোহার টুকরা বা স্ক্র্যাপ। গত অর্থবছরে পণ্যটি আমদানি হয় ৭৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ। গড়ে ৪ শতাংশ শুল্কহার রয়েছে পুরোনো লোহার পণ্য আমদানিতে।

আমদানিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পণ্য হলো এলপিজির উপাদান বিউটেন। গত বছর এই পণ্য আমদানি হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের। বাংলাদেশের শুল্কহার গড়ে ৫ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ আমদানি পণ্য হলো সয়াবিন বীজ। সয়াবিন তেল ও প্রাণিখাদ্য তৈরির এই কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৩২ কোটি ডলারের। এই পণ্য আমদানিতে শুল্ক-কর নেই।

চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা। এই পণ্য আমদানি হয়েছে ২৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের। এটিতেও শুল্ক-কর নেই। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির তালিকায় আরো রয়েছে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, হুইস্কি, গাড়ি, গম, উড পাল্প, পুরোনো জাহাজ, সয়াকেক, কাঠবাদাম ইত্যাদি।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া সর্বোচ্চ শুল্ক-কর আছে এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে হুইস্কি। হুইস্কিতে শুল্ক-কর ৬১১ শতাংশ। তবে আমদানি খুবই কম। গত বছর ২২৮ বোতল জ্যাক ডেনিয়েল হুইস্কি আমদানি হয়েছে দেশটি থেকে। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শুল্ক-করযুক্ত পণ্য হলো মার্সিডিজ বেঞ্জ। এই গাড়িতে শুল্ক-কর ৪৪৩ শতাংশ। গত বছর আমদানি হয়েছে চারটি গাড়ি।

এফপি/এসএন

Share this news on: