যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী অভিযান ও ভেনেজুয়েলার আশপাশে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং ভেনেজুয়েলা ও এর আশপাশে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির জেরে গত সপ্তাহে মার্কিন বিমান কর্তৃপক্ষ ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় চলাচলকারী বেসামরিক সব বিমান সংস্থাকে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানায়। এর মাঝেই শনিবার ভেনজুয়েলার আকাশ পুরোপুরি বন্ধ বলে গণ্য করার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই নির্দেশের পর ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শিগগিরই শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার লাতিন আমেরিকা সম্পাদক লুসিয়া নিউম্যান বলেছেন, ‘‘আমরা গতকালই প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে বলতে শুনেছি, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য ‘অজুহাত ও মিথ্যাচার’ বৃদ্ধি করছে।’’ শনিবার ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ বলে ট্রাম্প ঘোষণা দেওয়ার আগে ওই অভিযোগ করেন মাদুরো।
ট্রাম্প প্রশাসন পরিকল্পিত উপায়ে মাদুরো সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করছে। একই সঙ্গে আমরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিকোলাস মাদুরোর সাথে ‘‘জোরালো কথোপকথনের’’ প্রচেষ্টা চালানোর কথা শুনে আসছি। যদিও দুই রাষ্ট্রনেতার কথোপকথনের বিষয়টি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিকোলাস মাদুরোর মুখোমুখি বৈঠকের বিষয়ে এই কথোপকথন হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প বললেন, ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ
গত সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তথাকথিত ‘সোলিস কার্টেল’ নামের ভেনেজুয়েলার একটি সংগঠনকে মাদক-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এই সংগঠনটি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর নেতৃত্বে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এরপর হোয়াইট হাউস বলেছে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে আমরা যে মাদকবিরোধী অভিযান দেখছি তা স্থলপথে পরিচালিত হবে। ওয়াশিংটনের এসব পদক্ষেপের কারণে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে বলে নিশ্চিত ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
• ক্ষমতা থেকে মাদুরোকে বিতাড়িত করতে চান ট্রাম্প?
ভেনেজুয়েলায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক চার্লস স্যামুয়েল শাপিরো বলেছেন, মাদুরোর ওপর চাপ বাড়িয়ে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার লক্ষ্যেই ট্রাম্প এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।
তিনি বলেন, ‘‘এতে যা হচ্ছে, তা হলো মাদুরোর ওপর চাপের মাত্রা আরও বৃদ্ধি করা। আর এটা পরিষ্কার যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান, মাদুরো যেন ক্ষমতা ছাড়েন। আর সেটা হলে তাকে দেশ ছাড়তে হবে।’’
চার্লস স্যামুয়েল শাপিরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঠিক কী, তা পরিষ্কার নয়।
‘‘ট্রাম্প চাপ বাড়াচ্ছেন। এটি কি সামরিক পদক্ষেপ পর্যন্ত যাবে? এর উত্তর আমি দিতে পারছি না। আর আমার ধারণা, সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাউদার্ন কমান্ড ও প্রতিরক্ষা দপ্তর সব প্রশ্ন হোয়াইট হাউসে পাঠিয়ে দিচ্ছে।’’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধের বিষয়ে দেওয়া বিবৃতি নিয়ে সব ধরনের প্রশ্ন হোয়াইট হাউসের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড।
• চাপ প্রয়োগের নেপথ্যে ইরাকের পুনরাবৃত্তি?
শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সব বিমানসংস্থা, পাইলট, মাদক কারবারি এবং অন্যান্য অপরাধীদের সতর্ক করে দিয়েছেন। এতে তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে এই আকাশসীমা বন্ধ রাখার বিষয়টি কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য জানাননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি রোজিল্যান্ড জর্ডান বলেছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরাকের ওপর আকাশসীমা বন্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়; যা ১৯৮০’র দশকের শেষ দিকে শুরু হয়ে নব্বইয়ের দশকজুড়ে এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত চলেছিল।
তিনি বলেন, ওই সময় মার্কিন যুদ্ধবিমান আকাশসীমা পাহারায় নিয়োজিত ছিল এবং দেশটির ভেতরে-বাইরে কিংবা ইরাকের আকাশসীমা অতিক্রম করে কোনও বিমান চলাচল করতে দেওয়া হতো না।
ভেনেজুয়েলায়ও কি এমন কিছু হতে যাচ্ছে—তা আমরা জানি না। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরী বর্তমানে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছে। যেখানে কয়েক ডজন যুদ্ধবিমানও রয়েছে। তবে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ইরাকের মতো একই ধরনের অভিযান ভেনেজুয়েলায় পরিচালনা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
‘‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল নিকোলাস মাদুরোর সরকারের; যাকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত দেখতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী—ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রচারণার অংশ হিসেবে এই বিবৃতি দিচ্ছেন, নাকি এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র কোনও ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে, তা আমরা জানি না।’’
• ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি
আল জাজিরা বলছে, ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। চলতি বছরের আগস্ট থেকে ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি এলাকায় ১০ হাজার সৈন্য ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলার সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর গত কয়েক দশকের মধ্যে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ডি ফোর্ডকেও দক্ষিণ ক্যারিবীয় অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় রণতরী; যার নিজস্ব এয়ার উইংয়ে রয়েছে ৭৫টির বেশি যুদ্ধবিমান, উড়োজাহাজ ও হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিতে সক্ষম বিমান।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি ডেস্ট্রয়ার ত্রিনিদাদে নোঙর করেছে; যা ভেনেজুয়েলা উপকূলের খুব কাছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন রণসজ্জার মাঝে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে মাদুরোর সরকার। দেশজুড়ে হাজার হাজার সৈন্য ও রাশিয়ার তৈরি প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির পাল্টা হিসেবে এসব পদক্ষেপ নিয়েছে ভেনেজুয়েলা।
• কী বলছে ওয়াশিংটন?
ওয়াশিংটন বলছে, ভেনেজুয়েলা থেকে মাদক পাচার দমন করাই এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য। যদিও কারাকাস বলছে, ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তন করাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য।
গত সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ভেনেজুয়েলার কথিত মাদকবাহী ২০টির বেশি নৌযানে হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় ৮০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।
তবে যেসব নৌযানকে যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, সেগুলো মাদক পাচারের কাজে ব্যবহৃত হতো কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি ছিল, সেই বিষয়ে কোনও প্রমাণ প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন।
ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপ করলে ট্রাম্পের ‘রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটবে’
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অভিযান ও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় পরিচালিত বেসামরিক সব ফ্লাইটকে ‘‘অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বাড়তি সামরিক কার্যক্রমের’’ বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছিল।
ওই সতর্কতার পর দক্ষিণ আমেরিকার প্রধান ছয়টি এয়ারলাইন্স ভেনেজুয়েলায় ফ্লাইট স্থগিত করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কারাকাস স্পেনের আইবেরিয়া, পর্তুগালের ট্যাপ, কলম্বিয়ার অ্যাভিয়ানকা, চিলি ও ব্রাজিলের লাতাম, ব্রাজিলের গোল এবং তুর্কিশ এয়ারলাইন্সকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ভেনেজুয়েলার অভিযোগ, এসব এয়ারলাইন্স যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ দিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, এএফপি।
এবি/টিকে