আখাউড়া যুদ্ধ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য কৌশলগত অধ্যায়। এ যুদ্ধ প্রমাণ করেছে দৃঢ় মনোবল, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ছিল পরাজয়-অবধারিত শত্রুর বিরুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের মূল শক্তি।
রবিবার (৩০ নভেম্বর) ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী : আখাউড়া যুদ্ধ (৩০ নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৭১)’ শীর্ষক শিরোনামে এ মন্তব্য করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
আইএসপিআর জানায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের অন্যতম কৌশলগত এলাকা ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া।
ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট রেল যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় আখাউড়া রেলস্টেশন ও এর আশপাশের অঞ্চল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা দিঘি, উঁচু বাঁধ, রেললাইন ও পাকা স্থাপনাকে ঘিরে শক্ত প্রতিরক্ষা বলয় নির্মাণ করে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী এখানে ব্যাপক ফোর্স মোতায়েন করে। পুরো পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা টিকিয়ে রাখতে আখাউড়া দখলে রাখা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কিন্তু মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্স ও মিত্রবাহিনীর সমন্বিত পরিকল্পনা এই শক্তিশালী বলয়কেও ভেদ করতে সক্ষম হয়। ৩০ নভেম্বর যুদ্ধের শুরুতেই মিত্রবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী নোয়াপাড়া ও লোনাসার এলাকায় প্রথম আক্রমণ পরিচালনা করে। শত্রুপক্ষের শক্ত প্রতিরোধ সত্ত্বেও দিনব্যাপী এই অভিযান তাদের প্রথম ব্যূহ ভেঙে দেয়। ১ ও ২ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর মূল প্রতিরক্ষা কেন্দ্র আখাউড়া রেলস্টেশন ঘিরে তীব্র লড়াই শুরু হয়।
গঙ্গাসাগরের বাঁধ, রেললাইনের পাড় ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হয়ে মুক্তিবাহিনী ধীরে ধীরে শত্রুর দ্বিতীয় লাইন ভেদ করে। এই দুই রাতে পাকবাহিনী বারবার পাল্টা আক্রমণ চালালেও বড় ধরনের কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী তখন রেলস্টেশনের দক্ষিণাংশে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে পরবর্তী চূড়ান্ত আঘাতের প্রস্তুতি নেয়।
আইএসপিআর আরো জানায়, ৩ ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনী গঙ্গাসাগর রেলস্টেশন সম্পূর্ণ দখল করে। এতে পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষা চূড়ান্তভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে তারা বিকেলে প্রবল পাল্টা হামলা চালায়, যা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। তীব্র প্রতিরোধ সত্ত্বেও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পিছু হটেনি। গোলন্দাজসহ বিভিন্ন সহায়ক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তারা রেলস্টেশনের আশপাশ দখলে রাখতে সক্ষম হয়। ৪ ডিসেম্বর শুরু হয় সর্বাত্মক আক্রমণের প্রস্তুতি। মিত্রবাহিনীর মিডিয়াম ব্যাটারি, মর্টার, রকেট লঞ্চার ও পদাতিক বাহিনীর সমন্বিত আক্রমণে আখাউড়ার দক্ষিণ ও পশ্চিম অংশে শত্রুর প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ৫ ডিসেম্বর রাত- চারপাশে যুদ্ধের উত্তাপ। ঠিক এই রাতেই শুরু হয় আখাউড়ার ওপর যৌথ বাহিনীর চূড়ান্ত আক্রমণ।
উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণে যৌথ বাহিনীর একযোগে আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সকাল ৮টার মধ্যে আখাউড়ার পতন হয়। এই বিজয় পূর্বাঞ্চলীয় যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-আশুগঞ্জ-মন্দভাগ অঞ্চলে মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রা আরও দ্রুততর করে।
আখাউড়া যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য কৌশলগত অধ্যায়। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে দৃঢ় মনোবল, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ছিল পরাজয়-অবধারিত শত্রুর বিরুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের মূল শক্তি।
পিএ/টিএ