বিপিএলে ঢাকা ক্যাপিটালসের অধিনায়কত্ব করছেন। তবে এখন তিনি শুধু ক্রিকেটার নন। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সংকট মোচন ও কল্যাণের জন্য গঠিত ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (কোয়াব) বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন। খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেটারদের অবস্থা, আয়-উন্নয়নসহ সার্বিক বিষয় দেখার দায়-দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়।
মোস্তাফিজকে যেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ও কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) মিলে আইপিএলের বাইরে ঠেলে দিল, সেটিকে তিনি কীভাবে দেখছেন? এই ঘটনার জেরে শুধু ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কই নেতিবাচক হয়ে ওঠেনি, পুরো বাংলাদেশ দলই এখন নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় ভুগতে পারে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের মাটিতে টাইগারদের যে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার কথা, সেটি আদৌ হবে কি না—এই প্রশ্নও উঠছে। এরপরও কি বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে গিয়ে খেলবে? খেলার মতো পরিবেশ থাকবে?
এসব বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে পুরো ঘটনাকে হতাশাজনক ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন মোহাম্মদ মিঠুন। সেই কারণেই জাতীয় দলের হয়ে ১০টি টেস্ট, ৩৪টি ওয়ানডে ও ১৭টি টি-টোয়েন্টি খেলা এই কিপার-ব্যাটার পুরো বিষয়টিকে দুই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চান।
তার প্রথম কথা, ‘আমি কোনোভাবেই খেলাধুলার মধ্যে রাজনীতি পছন্দ করি না। স্পোর্টস আর পলিটিক্স—দুটো ভিন্ন জিনিস। হ্যাঁ, আমি জানি ‘স্পোর্টস পলিটিক্স’ বলে একটা কথা আছে, সেটা ভিন্ন। কিন্তু আমার দেশের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্য দেশের রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়ার কারণে যদি একটি দেশের একজন ক্রিকেটারের স্বপ্ন ভেঙে যায়, সেটা একজন ক্রিকেটার ও সহযোগী হিসেবে আমি মেনে নিতে পারছি না।’
এবার মোস্তাফিজকে সোয়া ৯ কোটি রুপিতে কিনেছিল কেকেআর। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো ক্রিকেটার আইপিএলের এক মৌসুমে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পাননি। খেলতে পারলে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১ কোটি টাকা পেতেন (আয়কর হিসেবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়া হতো)।
মিঠুন বলেন, ‘ভেবে অবাক হচ্ছি, ধর্মকে টেনে এনে পুরো পরিবেশটাই নষ্ট করে ফেলা হলো। আমার মনে হয়, মোস্তাফিজের জন্য এবারের আইপিএল ছিল খুব বড় ও বিশাল একটি প্ল্যাটফর্ম। জানি, কেউ কেউ হয়তো বলবেন, শুধু এবার কেন? মোস্তাফিজ তো আগেও কয়েকবার আইপিএল খেলেছে। কিন্তু না, আমার কাছে মনে হয় এবারের আইপিএল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় ছিল।’
এর কারণ ব্যাখ্যা করে মিঠুন বলেন, ‘প্রথমত, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আমেজ থাকতে থাকতেই এবারের আইপিএল শুরু হওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয়ত, মোস্তাফিজকে নিয়ে নিলামে অনেক দর-কষাকষি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দাঁড়িয়েছে সোয়া ৯ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি টাকা। সবার চোখ থাকতো তার দিকে। নিজের ক্যারিয়ারে বড় ধরনের সঞ্চারের একটি সুবর্ণ সুযোগ ছিল তার সামনে।’
সে কারণেই মিঠুনের বক্তব্য, ‘এটা শুধু মোস্তাফিজের জন্য নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রিকেটারের জন্যই অনেক বড় একটি না পাওয়ার আক্ষেপ। এটা আমাদের ক্রিকেটারদের জন্যও অনেক বড় পাওয়ার প্রেরণা হতে পারতো। আমরা সবাই খুব খুশি হয়েছিলাম। মোস্তাফিজের জীবনটাই পাল্টে যেতে পারতো। আমাদের দেশের ক্রিকেটাররা এক মৌসুমে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সাধারণত পান না।’
সবাই বিসিসিআই ও কেকেআরের এমন নেতিবাচক মানসিকতা ও পদক্ষেপের সমালোচনা করছেন। কোয়াব প্রধান হিসেবে তিনি কী চান—এমন প্রশ্নে মিঠুন বলেন, ‘আমার বিবেচনায় উত্তেজনা প্রশমন করে বিসিসিআই, বিসিবি ও কেকেআরের কর্তারা বসে আলোচনা করে বিষয়টির একটি ইতিবাচক সমাধানের পথ খোঁজা উচিত।’
ভারতের এমন নেতিবাচক মানসিকতার পর বাংলাদেশের সঙ্গে ক্রিকেটীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক আছে কি না? এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা তো সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটানোর মতোই একটি পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বাংলাদেশ সরকার কিংবা বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই মোস্তাফিজকে ভারতের মাটিতে গিয়ে আইপিএল খেলতে নিষেধ করেনি।
মোস্তাফিজের আইপিএলে খেলা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সভা-সমাবেশ হয়নি। তাহলে কয়েকটি উগ্র ধর্মীয় সংগঠনের অতিউৎসাহী মন্তব্যের জেরে বিসিসিআই ও কেকেআর যে সিদ্ধান্ত নিল, তার পরও কি বাংলাদেশের ভারতের মাটিতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলা উচিত?’
তিনি আরও বলেন, ‘যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। এরপর এক মাসের মধ্যে দল ভারতের মাটিতে গিয়ে খেলার মতো পরিবেশ পাবে কি না, সেটাও বড় প্রশ্ন।’
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও কিছু উগ্রবাদী ধর্মীয় সংগঠনের দাবি ও হুমকির মুখে বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্ত আগামী ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলার পথে বড় বাধা কি না? এমন প্রশ্নে মিঠুন বলেন, ‘অবশ্যই বড় বাধা। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। এক মোস্তাফিজকে নিরাপত্তা দিতে না পারলে, এক মাস পর পুরো বাংলাদেশ দলকে কীভাবে নিরাপত্তা দেবে?’
সবশেষে কোয়াব প্রেসিডেন্টের কঠোর মন্তব্য, ‘ভারত যদি আমাদের শত্রুর আসনে বসিয়ে তারপর চায় আমরা ভারতের মাটিতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলব; তা হওয়ার নয়।
আমাদেরও অধিকার আছে আমাদের ক্রিকেটারদের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার।’
টিজে/টিএ