ড. বদিউল আলম মজুমদার

‘মব আগেও ছিল, আমি নিজে আক্রান্ত হয়েছি- কিন্তু মিডিয়ায় গুরুত্ব পায়নি’

দেশে ‘মব’ বা বিশৃঙ্খল জনতার আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নতুন কোনো বিষয় নয় বরং অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে এবং তিনি নিজেও এর শিকার হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। তার মতে, বিগত সময়ে মব জাস্টিসের মতো ঘটনাগুলো ঘটলেও তখনকার গণমাধ্যমে তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়নি।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক এক বিভাগীয় সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মব জাস্টিস নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “মব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং মবের অবসান হওয়া দরকার। যত দ্রুত এর অবসান হয়, ততই দেশের জন্য মঙ্গল।”

এসময় তিনি আক্ষেপের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমার নিজের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। তখন মব ঘটিয়ে নানাভাবে আমাকে হেনস্তা করা হয়েছে।’

তিনি মনে করেন, দেশে পূর্বে মব হলেও তখনকার প্রতিকূল পরিবেশে সংবাদমাধ্যম সেগুলো সেভাবে তুলে ধরতে পারেনি বা গুরুত্ব দেয়নি।

গণতান্ত্রিক চর্চায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের গুরুত্ব প্রসঙ্গে ড. বদিউল আলম মজুমদার ভিন্নমতের অধিকার বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রত্যক্ষ নাকি পরোক্ষ হবে-এ নিয়ে কমিশনের আটজন সদস্যের মধ্যে সাতজন প্রত্যক্ষ ভোটের পক্ষে থাকলেও একজন সদস্য (তোফায়েল রহমান) ভিন্নমত পোষণ করেন।

তিনি বলেন, “আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাতজন এক পক্ষে থাকলেও, যিনি ভিন্নমত দিয়েছেন তার সেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আমরা আমাদের চূড়ান্ত সুপারিশে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করেছি।”

তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তী সময়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে ভিন্নমতকে নথিবদ্ধ করা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা।

রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে ভবিষ্যতে তাদের ‘নাগরিক আদালতের’ মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে সুজনের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘যদি দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তবে নাগরিক সমাজ বা নাগরিক আদালত ভবিষ্যতে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে পারে।’ আসন্ন নির্বাচনে দলগুলোকে তাদের ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট সংস্কারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করারও আহ্বান জানান তিনি।

বর্তমান রাজনীতি জনসেবার বদলে অর্থ উপার্জনের মুখ্য উপায়ে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের সম্পদ ও আয় আকাশচুম্বীভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের আয় ও তাদের ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদ কয়েক গুণ বেড়েছে, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে রাজনীতি এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এর বিপরীতে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির প্রার্থীদের সম্পদের বৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত সামান্য।"

সুষ্ঠু নির্বাচন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা নির্বাচনী ব্যবস্থার সংকট তুলে ধরে ড. বদিউল আলম ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘সেই সময় কোনো শক্তিশালী আইনি কাঠামো, আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) বা নির্বাচন কমিশন ছাড়াই একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হয়েছিল এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। অথচ বর্তমানে শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনমনে প্রবল উদ্বেগ রয়ে গেছে।’ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি কেবল নির্বাচন কমিশনের সংস্কার নয়, বরং আমূল কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেন।

পিএ/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে মমতাজের ৩ বাড়িসহ জমি জব্দের আদেশ Jan 13, 2026
img
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে সংস্কার স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়ে যাবে: খসরু Jan 13, 2026
img
হিমশিম খাচ্ছে অঙ্কুশের সিনেমা, জানালেন ‘দর্শক কেনার টাকা নেই’ Jan 13, 2026
img
আমরা এমন একটি সংসদ চাই, যেখানে মানুষের কথা বলা হবে: সালাহউদ্দিন Jan 13, 2026
img
নওগাঁয় রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার দাবিতে সমাবেশ Jan 13, 2026
img
টেকনাফে গুলিবিদ্ধ শিশুকে আইসিউ অ্যাম্বুলেন্সে আনা হচ্ছে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে Jan 13, 2026
কুরআনের এই অজানা বিষয় কি আপনি জানতেন? | ইসলামিক জ্ঞান Jan 13, 2026
img

সালমান শাহ হত্যা মামলা

সামিরা-ডনসহ ১১ আসামির সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন Jan 13, 2026
img
গানম্যান পেলেন জামায়াত আমির Jan 13, 2026
img
চতুর্থ দিনে দুপুর পর্যন্ত ২৩ জনের মনোনয়ন বৈধ করল ইসি Jan 13, 2026
img
মানবপাচার চক্রের ২ সদস্য গ্রেপ্তার Jan 13, 2026
img

জুলাই অভ্যুত্থান

২৫ শীর্ষ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ Jan 13, 2026
img
শেখ হাসিনা ও কামালের মৃত্যুদণ্ডের পুরো রায় প্রথমবার ওয়েবসাইটে প্রকাশ Jan 13, 2026
img
সুদানে সেনা সমাবেশে আধাসামরিক বাহিনীর ড্রোন হামলা, নিহত ২৭ Jan 13, 2026
img
বিএনপি নেতা ডাবলুর মৃত্যু: সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা ফখরুলের Jan 13, 2026
img
যারা ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাইছে তারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে: সেলিমা রহমান Jan 13, 2026
img
তীব্র উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করল ইরান Jan 13, 2026
img
মহার্ঘ ভাতা পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা, কোন গ্রেডে কত? Jan 13, 2026
img
অবশেষে ১৫ হাজার কোটির সম্পত্তি ফিরে পেলেন সাইফ আলি খান Jan 13, 2026
img
আইসিসি থেকে এখনো চিঠি পায়নি বিসিবি: আসিফ আকবর Jan 13, 2026