রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক তারকা ছিলেন এক সময়, এরপর জাবি আলোনসো তাদের হয়ে ডাগআউট পরিচালনারও স্বপ্ন দেখেছিলেন। জার্মান ক্লাব বায়ার লেভারকুসেনের হয়ে ইতিহাসগড়া সাফল্যের পর দায়িত্ব দেন লস ব্লাঙ্কোসদের। তবে মাত্র সাড়ে সাত মাসের মাথায় সেই অধ্যায়ের ইতি ঘটে গেল। সর্বশেষ বড়দিনের ঠিক আগে আট খেলায় মাত্র দুটি জয়ে আলোনসোর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়লেও পরের পাঁচ ম্যাচে টানা জয়ে চাপ কাটিয়ে ওঠেন। বার্সেলোনার কাছে স্প্যানিশ সুপারকোপার ফাইনালে হেরে সেই সুতাটা পুরোপুরি আলগা হয়ে গেছে।
রিয়ালের দায়িত্ব নিয়ে আলোনসো যখন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ফিরলেন, তখন চারদিকে ছিল আশাবাদী আবহ। গত গ্রীষ্মে ক্লাব বিশ্বকাপের আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে প্রথম ২০ ম্যাচের মধ্যে মাত্র তিনটিতে হার- শুরুর রেকর্ড ছিল দুর্দান্ত। নভেম্বর নাগাদ লা লিগায় পাঁচ পয়েন্ট এগিয়ে শীর্ষে ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু ৪৪ বছর বয়সী এই কোচকে ক্লাবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে সোমবারই নিজের পদ ছেড়ে দিতে হলো। এর আগেরদিন সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত সুপারকোপার ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে হারে ৩-২ গোলে।
রিয়াল খুব বেশি সময় নেয়নি, আলোনসোর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ক্লাবটিরই রিজার্ভ দলের কোচ এবং তার সাবেক সতীর্থ আলভারো আরবেলোয়া। লা লিগায় বার্সেলোনার চেয়ে মাত্র চার পয়েন্ট পিছিয়ে থাকা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শক্ত অবস্থানে থাকলেও আলোনসোর বিদায় এসেছে দীর্ঘদিনের জল্পনার পর। ড্রেসিংরুমে মতবিরোধ ছিল, খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সেও ছিল অসঙ্গতি। সাবেক এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের কাজের ধরন ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পরিকল্পনামুখী। কিন্তু ড্রেসিংরুম ও ক্লাবের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ তার পরিকল্পনা পূরণ করতে দেয়নি।
নিজস্ব কৌশলে জার্মানিতে বায়ার লেভারকুসেনকে অপরাজিত রেখে বুন্দেসলিগা জিতিয়েছেন আলোনসো। এর পেছনে ছিল তার ধারাবাহিক ও কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতি। তবে রিয়ালের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি প্রায় অসম লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তিনি পরিচিত ছিলেন ‘প্রজেক্ট ম্যানেজার’ হিসেবে, যিনি তরুণ দলকে ধাপে ধাপে নিজের দর্শনে গড়ে তুলতে চান। কিন্তু মাদ্রিদের মতো বড় ক্লাবে দীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্ট নিয়ে আসলেও তার জন্য সময়টা আগের মতো ব্যাপক নয়। কারণ এখানে ফলাফলই সব। রিয়ালে কোচের কৌশলগত দর্শনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে উপর ও নিচের স্তরকে সামলানোর ক্ষমতা।

রিয়ালের ম্যানেজার হিসেবে আলোনসোর যাত্রা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপ দিয়ে। পূর্ণ প্রি-সিজন না থাকায় প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেই তাকে ফরমেশন ও খেলোয়াড় নিয়ে পরীক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি চোট সমস্যাও তাকে ভুগিয়েছে। রুডিগার, মিলিটাও, কারভাহাল, আলাবা, হুইজসেন, মেন্ডি ও ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড বিভিন্ন মেয়াদে মাঠের বাইরে ছিলেন। লা লিগায় একটি ম্যাচেও তিনি একই একাদশ নামাননি। প্রতি ম্যাচে গড়ে ৩.১টি পরিবর্তন করেছেন। ফলে দলীয় স্থিতিশীলতা ছিল বেশ অধারাবাহিক। যার প্রতিফলন ঘটেছে মাঠে।
খেলার বিল্ড-আপে রিয়াল প্রায়ই পরিস্থিতিভিত্তিক তিন ডিফেন্ডারে রূপ নিত। অঁরেলিয়ে চুয়ামেনি মাঝমাঠ থেকে নেমে ডিফেন্সে যোগ দিয়ে তৈরি করতেন ৩-২-৫ বা ৩-বক্স-৩ কাঠামো। একই কাঠামো লেভারকুসেনেও প্রয়োগ করতেন আলোনসো। কখনও ৩-৫-২, আবার কখনও ৩-৪-৩ ফরমেশন সাজাতেন প্রতিপক্ষ দল অনুযায়ী। তবে খেলোয়াড়দের যার যার শক্তি অনুযায়ী কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন ৪২ বছর বয়সী এই টেকটেশিয়ান। বেলিংহ্যাম, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা ভালভার্দের কাছ থেকে সেরা পারফরম্যান্স আনতে পারেননি আলোনসো।
মিডফিল্ড থেকে আর্দা গুলার আক্রমণে সুযোগ তৈরি করলেও নিচে ফাঁকা জায়গা তৈরি হতো। এমবাপে ও ভিনিসিয়ুসের জুটি বাম দিককেন্দ্রিক আক্রমণে দলকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। আর ডান দিক থেকে মাস্তান্তুয়োনো, রদ্রিগো, ব্রাহিম দিয়াজ কিংবা ভালভার্দে তেমন জোর দিতে পারেননি। রিয়াল হয়ে উঠেছিল এমবাপে নির্ভর। ১৮ ম্যাচে ১৮ গোল করে এমবাপে ছিলেন দুর্দান্ত। দলের মোট গোলের ৪২ শতাংশই এসেছে তার কাছ থেকে।
এ ছাড়া ১১ জন মিলেই রক্ষণ করার দিকেও আলোনসো জোর দিয়েছিলেন। শুরুর দিকে উচ্চ প্রেসিংয়ে উন্নতি দেখা গেলেও মৌসুম যত সামনে গড়িয়েছে সেই তীব্রতা তত কমেছে। ফরোয়ার্ডদের নিষ্ক্রিয়তায় মাঝমাঠ ও রক্ষণে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। কার্লো আনচেলত্তির সময়ের মতো আক্রমণাত্মক স্বাধীনতা আলোনসোর আমলেও ছিল, কিন্তু রক্ষণ ও কাঠামোগত সংহতির অভাব দলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ব্যক্তিগত তারকা শক্তি বহু ম্যাচে বাঁচিয়েছে রিয়ালকে, তবে সামগ্রিকভাবে ভঙ্গুর হয়েছে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের ক্লাব। সেই ভঙ্গুরতা মেরামতের আগেই বিদায় নিতে হলো আলোনসোকে।
এসকে/টিএ