প্রেসিডেন্ট হিসেবে ৪০ বছর পূর্ণ করার পথে মুসেভেনি, কোন পথে হাঁটছে উগান্ডা!

উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইয়োয়েরি মুসেভেনির সমর্থকদের কাছে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে তাঁর বিপুল বিজয় ৪০ বছরের শাসনেরই এক ধরনের স্বীকৃতি। নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ৭২ শতাংশ ভোট। এটি তাঁর সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটের কাছাকাছি। ১৯৯৬ সালে উগান্ডার প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ৭৪ শতাংশ ভোট।

এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে ৮১ বছর বয়সী মুসেভেনি আবারও দাবি করছেন, ১৯৮৬ সালে মিল্টন ওবোতে সরকারের পতন ঘটিয়ে বিদ্রোহী কমান্ডার হিসেবে ক্ষমতা দখলের পরও তিনি এখনো উগান্ডার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন ধরে রেখেছেন।

তবে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক জনপ্রিয় পপ তারকা ববি ওয়াইন, এই ফলাফলকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, নিরাপত্তা বাহিনী তাঁর বাড়িতে অভিযান চালানোর পর তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন। মুসেভেনি মূলত তাঁর শাসনামলের অর্জনকে সামনে রেখেই প্রচারণা চালিয়েছেন। তাঁর দাবি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে তিনি উগান্ডায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছেন।

মুসেভেনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে উগান্ডাকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করবেন। তাঁর সমর্থকদের মতে, এটি হবে তাঁর শাসনের উপযুক্ত উত্তরাধিকার। কারণ, পরের বছর তিনি তাঁর সপ্তম এবং সম্ভবত শেষ মেয়াদ শেষ করবেন। এই লক্ষ্য অর্জনে উগান্ডার নবীন তেল শিল্পকে মুসেভেনি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি বারবার বলেছেন, তেল রপ্তানি শুরু হলে অর্থনীতি দ্বিগুণ হারে বাড়বে।

মুসেভেনি অক্টোবর মাসকে প্রথম অপরিশোধিত তেল রপ্তানির লক্ষ্য সময় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তানজানিয়ার ভারত মহাসাগরীয় বন্দর তাঙ্গা পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে এই তেল রপ্তানি হবে। বয়সের ভার সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট নিজেকে সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রণে থাকা নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। শেষ দিকের এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি দাবি করেন, উগান্ডার ১৪০ টির বেশি নির্বাচনী আসনের প্রতিটিতেই তিনি সফর করেছেন।

তবে অক্টোবরের শুরুতে তাঁর দল হঠাৎ করেই বেশ কয়েকটি নির্বাচনী কর্মসূচি বাতিল করে। কারণ হিসেবে বলা হয় ‘রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব’, যা অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। এতে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর কর্মসূচিতে আরও বিরতি সেই জল্পনাকে আরও জোরালো করে তোলে—অনেকে ক্লান্তি ও স্বাস্থ্যের অবনতির কথা বলতে শুরু করেন।

ববি ওয়াইনের জন্য এই ফলাফল ছিল বড় ধাক্কা। ২০২১ সালে যেখানে তিনি ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, এবার তা নেমে এসেছে ২৫ শতাংশে। অথচ উগান্ডার জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ—যাদের দীর্ঘদিন ধরে ৪৩ বছর বয়সী ওয়াইনের স্বাভাবিক সমর্থক বলে মনে করা হতো।

ওয়াইনের মতে, এই নির্বাচন ‘না বিশ্বাসযোগ্য, না বৈধ।’ তিনি বলেন, নির্বাচন ছিল মোটেও অবাধ ও সুষ্ঠু নয়। তাঁর অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী বারবার তাঁর সমাবেশ ভেঙে দিয়েছে। টিয়ার গ্যাস ও জীবন্ত গুলি ব্যবহার করে সমর্থকদের ভয় দেখানো হয়েছে, এমনকি কয়েকজন নিহতও হয়েছে। তিনি ব্যালট বাক্সে জালিয়াতির অভিযোগও তুলেছেন, তবে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি। কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

দুটি ব্যর্থ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এখন তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। আফ্রিকার অনেক বিরোধী নেতার মতো তাঁর অবস্থাও হতে পারে—যাদের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নে ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষমতার বাইরে স্থায়ীভাবে ছিটকে পড়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারে ওয়াইন ছিলেন উগান্ডার তরুণদের উদ্দীপনা ও অস্থিরতার প্রতীক। আর মুসেভেনি নিজেকে তুলে ধরেছেন অভিজ্ঞ অভিভাবক হিসেবে, যিনি স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেন। শেষ পর্যন্ত, বিতর্কিত সরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ভোটাররা বেছে নিয়েছেন দ্বিতীয় পথটিকেই। উগান্ডার ভবিষ্যৎ বোঝার ক্ষেত্রে এখন অনেকেই তাকিয়ে আছেন একটি প্রশ্নের দিকে—মুসেভেনির উত্তরাধিকার ও ক্ষমতা ছাড়ার সময় এবং প্রক্রিয়া কী হবে।

তবে উগান্ডার সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যালান কাসুজ্জা—যিনি একসময় বিবিসি নিউজডে রেডিও ও পডকাস্টের উপস্থাপক ছিলেন—এই বিষয়েই অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘উগান্ডায় পরিবর্তন, বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তন, হঠাৎ করে ঘটে না এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যতেও ঘটবে না। এটি ধীরে ধীরে ঘটে, এবং সেই প্রক্রিয়া বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে।’

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, নির্বাচনটি কোনো বড় রূপান্তরের মুহূর্ত নয়। বরং এটি রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের একটি নিয়মিত আচার—যার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট (এনআরএম) এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে চলতে থাকা গভীর ও ধীর পরিবর্তনগুলোকে বৈধতা দেওয়া হয়। এই পরিবর্তনের আভাস প্রথম দেখা যায় ২০২৩ সালের মার্চে মুসেভেনির মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের সময়। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে এনআরএমের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা সেন্ট্রাল এক্সিকিউটিভ কমিটির নির্বাচনে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সাধারণ কোনো অভ্যন্তরীণ নির্বাচন না হয়ে এটি পরিণত হয় মুসেভেনি-পরবর্তী যুগে অবস্থান নিশ্চিত করার এক উচ্চ ঝুঁকির লড়াইয়ে। দলাদলি দর–কষাকষি ও ব্যাপক ঘুষের অভিযোগে ভরা এই নির্বাচন দেখিয়ে দেয়, বিরোধী দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতার চেয়ে এখন ক্ষমতাসীন শিবির বেশি ব্যস্ত উত্তরাধিকার রাজনীতিতে। বিরোধীদের একাংশকে নিরাপত্তা বাহিনী দমন করেছে, আর একাংশকে আত্তীকরণ করা হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেনাপ্রধান জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবার প্রভাব—তিনি প্রেসিডেন্টের ছেলে এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরি। দলের পুরোনো প্রজন্মের অনেক প্রভাবশালী নেতা সরে গেছেন। তাঁদের জায়গায় এসেছেন নতুন মুখ, যাঁদের অনেকেরই ৪০ বছর আগে মুসেভেনিকে ক্ষমতায় আনা যুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা নেই, তবে তাঁরা মূলত তাঁর ছেলের প্রতি অনুগত বলে পরিচিত।

প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, স্টেট হাউসে ক্ষমতা এখন ক্রমেই বিকেন্দ্রীকৃত হচ্ছে। একসময় যেসব সিদ্ধান্ত সরাসরি মুসেভেনি নিতেন, সেগুলো এখন তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ছোট একটি বলয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। মুসেভেনির দৈনন্দিন কর্মসূচি তদারক করছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা নাতাশা কারুগিরে।

বিদেশি কূটনীতিক ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক দেখাশোনা করছেন তাঁর সৎভাই সালিম সালেহ। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নীতিতে প্রভাব রাখছেন তাঁর জামাতা ওড্রেক রওয়াবোগো, যিনি মুসেভেনির দ্বিতীয় কন্যা প্যাটিয়েন্সের স্বামী। আর উগান্ডার আধুনিক ইতিহাসে এই প্রথম, দেশের সব ধরনের নিরাপত্তা—অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক—তত্ত্বাবধান করছেন প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান, ৫১ বছর বয়সী জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবা।

উগান্ডার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক বাহিনীর প্রভাব প্রবল। মুসেভেনি নিজেও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। ফলে এই ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে—উগান্ডার ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে মুসেভেনির ছেলের হাত ধরে। যদিও এখনো তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক পদে বসেননি।

টিজে/টিএ 

Share this news on:

সর্বশেষ

img
দেশের বাজারে আজ কত দামে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ Jan 19, 2026
img

পটুয়াখালী–৩

স্বতন্ত্র মামুনের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ গণঅধিকারের ফাহিমের Jan 19, 2026
img
রিয়ালের সাবেক কোচ জাবি আলোনসোকে চায় ফ্রাঙ্কফুর্ট! Jan 19, 2026
img
ব্যক্তিগত জীবনেই সুখ খুঁজছেন অভিনেত্রী শ্রদ্ধা কাপুর! Jan 19, 2026
img
আপস নয় আত্মসম্মানেই বিশ্বাসী অভিনেত্রী তামান্না ভাটিয়া Jan 19, 2026
img

লা লিগা

রিয়াল সোসিয়েদাদের কাছে ২-১ গোলে ধরাশায়ী বার্সেলোনা Jan 19, 2026
img
সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলারসহ অপহরণের শিকার ৫ জেলে Jan 19, 2026
img
মরক্কোকে কাঁদিয়ে দ্বিতীয়বার আফ্রিকান নেশন্স কাপ জিতল সেনেগাল Jan 19, 2026
img
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ আল-শারার সঙ্গে কুর্দিশ নেতার ফোনালাপ Jan 19, 2026
img
যশোর-২ আসনের প্রার্থিতা ফিরে পেলেন জামায়াত প্রার্থী ডা. ফরিদ Jan 19, 2026
img
ফ্যাসিবাদী শক্তি রুখে দেওয়ার একমাত্র পথ ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করা: নজরুল ইসলাম Jan 19, 2026
img
কিছু হলেই মব তৈরি করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি: নাছির উদ্দিন নাছির Jan 19, 2026
img
কানাডার বাজারে ঢুকছে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি, যুক্তরাষ্ট্র বলল ‘পস্তাতে হবে’ Jan 19, 2026
img

অস্ট্রেলিয়ান ওপেন

আলকারাজ ও সাবালেঙ্কার জয়, তবে বিদায় নিল ভেনাস উইলিয়ামস Jan 19, 2026
img
কুমার সানুর চোখে বলিউডের সর্বকালের সুন্দর জুটি সালমান-ঐশ্বরিয়া Jan 19, 2026
img
এবার নির্বাচনের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী Jan 19, 2026
১০ মিনিটে গোটা বিশ্বের সারাদিনের সর্বশেষ আলোচিত সব খবর Jan 19, 2026
জুলাই যোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে নতুন বিভাগ করতে চায় বিএনপি Jan 19, 2026
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আলাদা বিভাগ হবে Jan 19, 2026
img
অল্লু অর্জুনের পোস্টে কোভিড চলচ্চিত্র ‘পুষ্পা’ থেকে AA22×A6 ক্যালেন্ডার প্রকাশ Jan 19, 2026