আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) এক প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ এবং ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিত্রিত করার মিয়ানমারের সাম্প্রতিক অপচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মিয়ানমারের এই ধরনের বানোয়াট আখ্যান রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নৃশংস অপরাধ ও জাতিগত নিধনকে ন্যায্যতা দেওয়ার একটি নির্লজ্জ প্রচেষ্টা মাত্র।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। ২০১৬-১৭ সালে সংঘটিত পাশবিক নির্যাতন থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরাতে এবং তাদের রাষ্ট্রহীন করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমার এই বিতর্কিত নামকরণ ব্যবহার করছে। অথচ ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে মিয়ানমার নিজেই রোহিঙ্গাদের “বার্মার বৈধ বাসিন্দা” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে মিয়ানমার দাবি করেছিল যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ৫ লাখ মানুষ রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল। এই দাবির কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ বলেছে, তৎকালীন ১৭ লাখ জনসংখ্যার রাখাইনে এত বিশাল মানুষের অনুপ্রবেশ কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না এবং মিয়ানমার এর পক্ষে কোনো নথিও পেশ করতে পারেনি। মূলত নিজের দায় এড়াতে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে তারা এসব ভিত্তিহীন তথ্য ছড়াচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে, এই ধরনের মিথ্যা আখ্যান তৈরি আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার একটি অপচেষ্টা। রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না করা এবং আট বছর ধরে প্রত্যাবাসন পিছিয়ে দেওয়া মূলত ২০১৭-১৮ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার ও রাখাইনের ওপর কর্তৃত্বশীলদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা রোহিঙ্গাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রকৃত অঙ্গীকার প্রদর্শন করে।
প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গারা একটি স্বতন্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী। ১৭৮৫ সালে বার্মান সাম্রাজ্যের অংশ হওয়ারও কয়েক শতাব্দী আগে থেকে তারা আরাকানে (বর্তমান রাখাইন) বসবাস করে আসছে। আরাকানের প্রাচীন রাজধানী ‘ম্রো-হং’ বা ‘রোহাং’-এ তাদের দীর্ঘ উপস্থিতির কারণেই তারা ‘রোহিঙ্গা’ নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক রেকর্ড, ঔপনিবেশিক জনতাত্ত্বিক বিবরণ এবং স্বাধীন বার্মার শুরুর দিকের নথিপত্র প্রমাণ করে যে, তাদের শিকড় রাখাইনের মাটির অনেক গভীরে। ১৯৪২ সালের নাগরিকত্ব আইনের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা বার্মার রাজনীতি ও সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
ইউটি/টিএ