সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ৭৯তম জন্মদিন আজ। জীবনের আরও একটি বছর পেরিয়ে নতুন বছরে পা রাখলেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। বিশেষ এই দিনটি উপলক্ষে তিনি এক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন।
জন্মদিন উপলক্ষে রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাতে ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দঘন সময় কাটান মির্জা ফখরুল। ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় নিজ বাড়িতে জন্মদিন উদযাপন করেন বিএনপির মহাসচিব। রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথম প্রহরে স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ও পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে জন্মদিনের কেক কাটেন তিনি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠের ব্যস্ততা থেকে এই সময়টুকু তিনি একান্তই নিজের আপনজনদের সঙ্গে কাটান। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেন তিনি।
৭৯ বছরে পা দেওয়া প্রবীণ রাজনীতিক মির্জা ফখরুলের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিভিন্ন স্তরের জনগণ।
বিএনপির মহাসচিব বলেন, শরীরটা একটু খারাপ। নির্বাচনী গণসংযোগে টানা কর্মসূচির কারণে ধুলাবালি ও ঠান্ডা-গরম মিলে গলা ব্যথা করছে। জন্মদিন উপলক্ষে ফোনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষী এবং ভক্ত-অনুসারীদের শুভেচ্ছা বার্তায় সিক্ত হয়েছেন তিনি। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এছাড়াও ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সুধীজন বিএনপির মহাসচিবকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে মির্জা ফখরুল বলেন, ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে দেশের মানুষের মুক্তি এবং একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়াই এখন তার মূল লক্ষ্য। তিনি প্রত্যাশা করেন, সামনের দিনগুলোতে দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
মির্জা ফখরুলের বাবা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন (চোখা মিয়া) ও মাতা মরহুমা মির্জা ফাতেমা আমিন। শিক্ষাজীবনে মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমিন একজন আইনজীবী ছিলেন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের দুই মেয়ে। তার বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। বর্তমানে তিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে বাবার জন্য ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনী গণসংযোগ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে রাজধানীতে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
বিএনপির মহাসচিবের সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। বর্তমানে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ২০১১ সালের মার্চে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
জানা যায়, ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। অন্যান্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে একজন নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সাল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বারী পদত্যাগ করার পর মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। এ সময় তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন।
রাজনৈতিক জীবন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (অধুনা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) একজন সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলছে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একইসঙ্গে জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ নির্বাচন ও মন্ত্রিত্ব ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপি থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিবও ছিলেন।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলেও সংসদে যোগ দেননি তিনি।
বিগত স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের আমলে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় বারবার কারাবরণ করেছেন প্রবীণ এই রাজনীতিককে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলনে তিনি ছিলেন সম্মুখ যোদ্ধা।
পিএ/টিকে