‘আয়নাঘর নামে যে ঘরে আমাকে বন্দি রাখা হয়েছিল তার দেয়ালে কোনো আয়না ছিল না।’ আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নে এমন কথা উল্লেখ করেছেন জেআইসিতে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে হাসিনুরকে জেরা করেন আজিজুর রহমান দুলু। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
দ্বিতীয় দিনের মতো আজ হাসিনুর রহমানের জেরা অনুষ্ঠিত হয়। ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকীর হয়ে আইনি লড়াই করেন আইনজীবী দুলু।
জেরার একপর্যায়ে হাসিনুরের বিএ নম্বর জানতে চান আসামিপক্ষের আইনজীবী। জবাবে দুলু বলেন, আমার বিএ-২৬১১। আমি দশম বিএমএ লং কোর্সে কমিশনপ্রাপ্ত। কোর্ট মার্শাল রায়ের পর আমার বিএমএ নম্বর বাংলাদেশ আর্মির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিএমএইচসহ ইত্যাদিতে সাসপেন্ড কিনা জানি না। তবে আমার বিএ নম্বর সংক্রান্ত নথিপত্র সেনাসদরে নেই। শুনেছি ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কার কাছে শুনেছি মনে নেই।
এরপর তার ঠিকানা প্রসঙ্গে জানতে চান দুলু। তিনি বলেন, আমার বর্তমান ঠিকানা ২০২২ সালের জুন মাস থেকে বসবাস করছি। তাই মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে লিখিত কোনো সমন বা নোটিশ পাইনি। তবে মৌখিকভাবে সময়-তারিখসহ সাক্ষীর জন্য হাজির হতে বলেছেন প্রসিকিউটর উদয় তাসমির।
এ সময় আইনজীবী বলেন, আপনি প্রসিকিউশনের শেখানো মতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবাবে সত্য নয় বলে জানান সাক্ষী। এরপর হাসিনুরকে প্রশ্ন করা হয়, প্রথম দফায় গুমের পর কত তারিখে আপনাকে অফিসার্স সেলে রাখা হয়েছিল। প্রতুত্তরে তিনি বলেন, প্রথম দফায় গুমের পর আমাকে যে তারিখে অফিসার্স সেলে আটক রাখা হয়, সেই তারিখ মনে নেই। ওই সময় আমাকে ৪৩ দিন গুম রাখা হয়।
এরপর তার পদোন্নতি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় হাসিনুর বলেন, আমি ক্রমান্বয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদ থেকে লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন, মেজর ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি পাই। মেজর হিসেবে আমি মিলিটারি পুলিশে পদায়িত হই। লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থাকাকালীন বিডিআরের দুটি রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। র্যাব-৫ ও ৭-এর অধিনায়ক ছিলাম।
দ্বিতীয় দফায় গুমের পর ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তর বা ভবনে গিয়েছিলেন কিনা; আইনজীবীর এমন প্রশ্নে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গুম থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত আমি ডিজিএফআই ভবনে যাইনি। চব্বিশের ৫ আগস্ট পর ডিজিএফআইয়ের ডিজির ভবনে একবার গিয়েছি। আর আয়নাঘরে একবার গিয়েছি প্রসিকিউটরের সঙ্গে। তবে ৫ আগস্ট ডিজিএফআই এলাকায় গিয়েছি বন্দিদের উদ্ধারের জন্য।
সাক্ষীর উদ্দেশ্যে আইনজীবী দুলু বলেন, ডিজিএফআইয়ের কয়টি ব্যুরো রয়েছে। জবাবে হাসিনুর বলেন, তা আমি জানি না। সিআইবির নামও শুনিনি। এছাড়া প্রথম দফায় যে ৪৩ দিন আর্মি ইন্টারোগেশন সেলে বন্দি ছিলাম। তার পুরো সময় চোখ বেঁধে রাখা হতো। বাথরুমে যাওয়ার সময় চোখ খুলে দিতো। তবে হাতে হাতকড়া লাগানো থাকতো। ওই সময় আমাকে মাঝে মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
আয়নাঘরে কয়টি সেল ছিল; এমন প্রশ্নে এই সাক্ষী বলেন, আয়নাঘরে অবস্থিত ১০টা সেল, যার একটিতে আমাকে বন্দি রাখা হয়েছিল। এগুলোকে রিমান্ড সেল বলা হতো। জিজ্ঞাসাবাদের সময় জমটুপি পরানো হতো।
এ সময় প্রশ্ন ছুড়ে দুলু বলেন, কীভাবে আয়নাঘর শব্দটি এলো। তখন হাসিনুর রহমান বলেন, নেত্র নিউজের এডিটর ইন চিফ তাসনিম খলিলের মাধ্যমে আয়নাঘর শব্দটি মিডিয়ায় প্রথম প্রচারিত হয়।
এরপরই আয়নাঘরে কোনো আয়না দেখতে পেয়েছিলেন কিনা জানতে চান আসামিপক্ষের আইনজীবী। উত্তরে সাক্ষী বলেন, আয়নাঘর নামে যে ঘরে আমাকে বন্দি রাখা হয়েছিল, তার দেয়ালে কোনো আয়না ছিল না। তবে আমাকে যে বন্দিশালায় রাখা হয়েছিল তাকে যে আয়নাঘর নামে ডাকতো তা আমি প্রথমে তাসনিম খলিলকে বলি।
এছাড়া গুমের সময় রাখা কক্ষের বর্ণনা নিয়েও প্রশ্ন করেন দুলু। তখন সাক্ষী বলেন, জবানবন্দিতে আমি যে কক্ষের উচ্চতা ১৬-১৮ ফুট বলেছি। সেই কক্ষের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১০-১২ ফুট ও প্রস্থ আনুমানিক ৮-১০ ফুট।
তখন আইনজীবী বলেন, আপনি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সম্পর্কে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবাবে সত্য নয় বলে জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান।
এর আগে, মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের সামনে অবশিষ্ট সাক্ষ্য সম্পন্ন করেন গুমের শিকার সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। তার জবানবন্দি শুরু হয় ২৫ জানুয়ারি। তিনি এ মামলার দুই নম্বর সাক্ষী। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
এদিকে, আজও এ মামলায় গ্রেপ্তার তিনজনকে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
এছাড়া পলাতক ১০ আসামির পাঁচজনই ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
অন্যরা হলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এসবের সময়কাল হলো ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত। এ সময়টায় গুম হন ২৬ জন।
এবি/টিএ