নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা হচ্ছে আজ, নেই কোনো স্বস্তির বার্তা

ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং উচ্চ সুদের চাপে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য যখন গভীর সংকটে, ঠিক সেই সময় চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি–জুন) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই নীতিতে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী কিংবা আমানতকারীদের জন্য দৃশ্যমান কোনো স্বস্তির বার্তা থাকছে না।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় অনুমোদনের পর আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে মুদ্রানীতি বিবৃতি (এমপিএস) প্রকাশ করা হবে। নতুন নীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আগের মতোই কড়াকড়ি বা সংকোচনমূলক অবস্থান বজায় রাখা হচ্ছে। ফলে নীতিগত সুদহার বা পলিসি রেপো রেট ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত থাকছে।
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও চাপ রয়ে গেছে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পরিসংখ্যানে সামান্য কমার আভাস মিললেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে তার প্রতিফলন নেই। এক সময় দুই অঙ্কে থাকা সার্বিক মূল্যস্ফীতি অক্টোবরে নেমে আসে ৮.১৭ শতাংশে। যদিও নভেম্বর ও ডিসেম্বরে তা আবার বেড়ে যথাক্রমে ৮.২৯ এবং ৮.৪৯ শতাংশে দাঁড়ায়।

খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং উৎপাদন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এই মূল্যচাপ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্য-বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের বেশি, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার কমানোর ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়।

বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রশ্নে অনিশ্চয়তা
নীতিগতভাবে কড়াকড়ি অবস্থান বজায় রাখার ব্যাখ্যা দিলেও অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বড় প্রশ্ন—উচ্চ সুদহার বহাল রেখে বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে, যখন ব্যাংকগুলো নিজেরাই তারল্য সংকটে ভুগছে?

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল মুদ্রানীতির সীমাবদ্ধতা নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত ও নৈতিক সংকটের ফল। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ-খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দায়মুক্তি এবং সাম্প্রতিক ব্যাংক রেগুলেশনের মাধ্যমে লোকসানের বোঝা পরোক্ষভাবে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর ফল হিসেবে আমানত প্রবাহ কমে গেছে। অনেক মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন। এই পরিস্থিতিতে সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও ঋণ বিতরণ বাড়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতার ব্যবধান
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বর পর্যন্ত প্রকৃত অর্জন হয়েছে প্রায় ৬.৫ থেকে ৬.৬ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে জুন পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এটি অর্জনযোগ্য নয়।

তাদের বক্তব্য, উচ্চ সুদহার, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বাজারে চাহিদা হ্রাস—সব মিলিয়ে নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি।

সুদের করিডরেও বড় পরিবর্তন নেই
নতুন মুদ্রানীতিতে নীতিগত রেপো হারের পাশাপাশি সুদের হার করিডরের অন্যান্য সূচকেও বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না। স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) সর্বোচ্চ হার, স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) সর্বনিম্ন হার এবং ওভারনাইট রেপো হার প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে।

এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদী আমানত রেখে কিছুটা কম সুদ পেলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার খরচ কমছে না। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের চাপ আপাতত অব্যাহত থাকছে।

বর্তমানে গড় ঋণ সুদহার প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিথিলতার সুযোগ ছিল বলে মত অর্থনীতিবিদদের
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুদ্রানীতিতে কিছুটা শিথিলতার সুযোগ ছিল। তার মতে, ডলারের বাজার এখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং আমদানির খরচ আগের মতো চাপ সৃষ্টি করছে না। এই পরিস্থিতিতে পুরোপুরি সংকোচনমূলক নীতিতে আটকে থাকার প্রয়োজন ছিল না।

অন্য দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান হলো—মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে যদি ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বস্তি ফিরবে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ হবে এবং কর্মসংস্থানে গতি আসবে। তবে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গভর্নরের ব্যাখ্যা ও ফরেক্স বাজারের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্বীকার করেছেন, সুদহার কমানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীদের দাবির যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে তার মতে, নীতিগতভাবে এখনো সেই সুযোগ তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, এক সময় মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের ওপরে ছিল, এখন তা ৮ শতাংশের ঘরে এসেছে—এটি অগ্রগতি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য আরও নিচে নামানো। মানুষের মধ্যে যে ধারণা তৈরি হয়েছে—দাম বাড়তেই থাকবে—এই মানসিকতা ভাঙতে সময় লাগে।

ফরেক্স বাজারের অগ্রগতির বিষয়ে গভর্নর জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে এক ডলারও বিক্রি করেনি। বরং বাজার থেকেই প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং কারেন্ট ও ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট তুলনামূলক ভারসাম্যে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের অভিমত, বর্তমান মুদ্রানীতি স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক সূচকে শৃঙ্খলা আনতে সক্ষম হতে পারে। তবে বড় ঋণ-খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে এই কঠোর নীতির প্রত্যাশিত সুফল বাস্তব অর্থনীতিতে পাওয়া যাবে না।

উল্লেখ্য, বরং ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা—নতুন মুদ্রানীতিও আগের মতো কাগজে শক্ত থাকলেও বাস্তব মাঠ-পর্যায়ে দুর্বলই থেকে যাবে।

টিজে/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
মায়েদের ইজ্জতের বিনিময়ে ফ্যামিলি কার্ড চাই না: জামায়াত আমির Jan 29, 2026
img
তোমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা লড়ে যাব: জামায়াত আমির Jan 29, 2026
img
রিট খারিজ, শুক্রবারই হচ্ছে ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা Jan 29, 2026
img
হিটের পর নিঃশব্দ, রহস্যময় পরিচালক মোহিত সুরি! Jan 29, 2026
img
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেবে তুরস্ক Jan 29, 2026
img
চানখারপুলে ৬ হত্যা: আসামিদের সাজা বৃদ্ধির আপিল করেছে প্রসিকিউশন Jan 29, 2026
img
ক্রিকেট দল না গেলেও শুটিং দলকে ভারত সফরের অনুমতি দিল সরকার Jan 29, 2026
img
দেশ পরিচালনার জন্য হাতপাখা প্রতীকে ভোট দিন : রেজাউল করীম Jan 29, 2026
img
চোখের ভাষায় বলিউডের অভিনয়ের জাদু! Jan 29, 2026
img
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা: যুদ্ধ কি অত্যাসন্ন? Jan 29, 2026
img
সাংবাদিকদের পাশে থাকার অঙ্গীকার সালাউদ্দিন টুকুর Jan 29, 2026
img
৩৫ শতাংশ সফলতায় অক্ষয় কুমারের বক্স অফিস চ্যালেঞ্জ! Jan 29, 2026
img
পুলিশের ৪০ কর্মকর্তা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার Jan 29, 2026
img
‘কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়’ Jan 29, 2026
img
অপমানিত বোধ করায় ক্রিকেট বিশ্বকে বিদায় জানিয়েছিলেন যুবরাজ Jan 29, 2026
img
ইমরান খানকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, জানালেন তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার Jan 29, 2026
img
দুলকার সালমানের ক্লাসি সিনেমায় অভিনেত্রী শ্রুতির ঝলক! Jan 29, 2026
img
বিশ্বকাপ থেকে সড়ে আসায় ক্রিকেটারদের নিয়ে শুরু হচ্ছে কন্ডিশনিং ক্যাম্প Jan 29, 2026
img
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে কী হবে, মুখ খুলল চীন Jan 29, 2026
মার্কিন হামলার কতটা শক্তিশালী জবাব দিবে ইরান Jan 29, 2026