এবার নিশিরাতে নির্বাচন করতে দেব না : তারেক রহমান

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ভোটের দিন ফজরের ওয়াক্তে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ফজরের জামাত আদায় করতে হবে। যাতে করে ১৬ বছর যেমন নিশিরাতে নির্বাচন হয়েছিল আমরা এবার আর তা করতে দেব না। ১৬ বছর যেমন আমু-ডামু নির্বাচন হয়েছিল আমরা এবার করতে দেব না। এবার হচ্ছে জনগণের পালা, জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে তারা কী করবে।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) রাতে রংপুর নগরীর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব ধর্মের ভোটারদেরভোরবেলা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে। যাতে কেউ কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র করতে না পারে। সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।


তিনি বলেন, এই রংপুর হচ্ছে আবু সাঈদের পবিত্র রক্ত মেশানো মাটি। যে ত্যাগ আমরা জুলাইতে দেখেছি সেটা কখনো বৃথা যেতে পারে না। আমাদের যে কোনোভাবে সেটা আগে মূল্যায়ন করতে হবে। আবু সাঈদসহ যে ১৪০০ ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন আমরা তখনই করতে পারব যখন এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।

তারেক রহমান বলেন, অনেক মানুষ বলে রংপুর হলো গরিব অঞ্চল কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এই অঞ্চল অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অঞ্চল। শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা, ব্যক্তি ও নেতৃত্বের। তাহলেই আমরা এই বিভাগের আমূল পরিবর্তন করতে পারব।

বিএনপির আমলে এ অঞ্চলের মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তখন এ অঞ্চলের বেশি সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে তথাকথিত উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে কিন্তু মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য সঠিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়নি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় টিকে থাকার জন্য নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য, মিল, কলকারখানা এখানে কিছুই করা হয়নি।

তারেক রহমান বলেন, একটু আগে আমি আবু সাঈদের বাড়ি থেকে আসলাম। আমি জানতাম না সেইখানেও পর্যন্ত কয়লা আছে। আমি জানতাম দিনাজপুরে কয়লা আছে। কিন্তু আজ আমি শুনলাম সেখানেও কয়লা আছে। এই কয়লা যদি আমরা উত্তোলন করতে পারি তাহলে আমরা অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারব।


বিগত ১৬ বছর কৃষকরা নির্যাতিত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ অঞ্চল হচ্ছে কৃষি প্রধান অঞ্চল, এলাকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। এজন্যই আমরা দেখেছি বিগত ১৬ বছরে সমাজের অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কৃষক ভাইয়েরা কীভাবে নির্যাতিত হয়েছে। কৃষিজাত পণ্য দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের কষ্টের শিকার হতে হয়েছে।

সরকার গঠন করলে কৃষকদের কৃষি ঋণ ও এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ পরিশোধের ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমরা হিসাব-নিকাশ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি— আপনাদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারলে যাদের কৃষি ঋণ বর্তমানে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আছে, তা সুদসহ মওকুফ করা হবে। সারা দেশের কৃষকদের কৃষি ঋণ ১০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হবে।


এছাড়া তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কষ্টে থাকার কারণে এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করে থাকে। বিএনপি সরকার গঠন করলে এসব ক্ষুদ্রঋণ সরকারের পক্ষ থেকে এনজিওগুলোকে পরিশোধ করা হবে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষকে আর সেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে না।
এই অঞ্চলকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে এখানকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে যেমন প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিপুল কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনা। বাংলাদেশের খুলনা-চট্টগ্রাম-ঢাকা অঞ্চল যদি শিল্পবেল্ট হতে পারে, তবে রংপুর বিভাগসহ রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও এলাকায় কেন কৃষিজাত পণ্যের শিল্প গড়ে উঠবে না— সে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষিজাত পণ্যভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে তারা এ অঞ্চলে এসে মিল ও কারখানা স্থাপন করেন। এর ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এছাড়া তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে বিপুল সংখ্যক তরুণ-যুবক আইটি খাতে কাজ করছেন। আইটি কোম্পানিগুলো যদি এই অঞ্চলে এসে তাদের কোম্পানিগুলো স্থাপন করে এবং স্থানীয় দক্ষ জনশক্তিকে চাকরির সুযোগ দেয়, তবে সেসব কোম্পানিকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত কর ছাড় দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে।

তারেক রহমান বলেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে শহীদ আবু সাঈদের স্বপ্নের একটি অংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বড় যেটি কাজ বাকি থাকবে সেটি হলো এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে আনা। আমরা একা এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে পারব না। কারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে পরিবর্তন হয়েছিল তা কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বারা হয়নি। নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে হয়নি। এ দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল বলেই সেদিন সেই পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল।
জুলাইয়ের পরিবর্তন ধরে রাখার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণকে সামনের কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে।


সামনের কাতারে দাঁড়ানোর অর্থ হলো নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করতে হবে। এজন্য দেশের আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যে নির্বাচন হচ্ছে এতে আপনাদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অধিকার প্রয়োগ করতে হবে। অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে আপনারা সঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচন করবেন যারা আপনার এই এলাকার উন্নয়ন করবে।


ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড সুবিধার কথা জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের যদি অর্থনৈতিক অংশে পরিণত না করি তাহলে কোনোভাবে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। নারী সমাজকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য একটি কার্ড তাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেক গৃহিণী বা প্রত্যেক মায়েদের কাছে একটা করে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। যে কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেকটি পরিবারকে আমরা সহযোগিতা পৌঁছে দিতে চাই- যার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে, অর্থনীতির উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।


তিনি বলেন, কৃষকদের কাছে আমরা একইভাবে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেব। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে জমি অনুযায়ী একটি ফসলের সম্পূর্ণ বীজ, সার, কীটনাশক তাদের হাতে তুলে দিতে চাই। যাতে তাদের উপর অর্থনৈতিক চাপ কমে এবং তারা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।
এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলুসহ রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও কেন্দ্রীয়-স্থানীয় নেতারা। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু।

ইউটি/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

img
‘জওয়ান’-এর সিক্যুয়াল নিয়ে কী বললেন পরিচালক অ্যাটলি? Jan 31, 2026
img
প্রাচীন তামিল সাহিত্যের কাহিনি নিয়ে মহাকাব্যিক ছবি Jan 31, 2026
img
পর্দা থেকে সমাজ, সালমান খানের প্রভাব সর্বত্র Jan 31, 2026
img
আলোচিত ধারাবাহিক নাটকের রেকর্ড, বিলিয়ন ভিউ অতিক্রম Jan 31, 2026
img
আল্লু অর্জুনের নতুন ছবিতে শ্রদ্ধা কাপুর, জোর জল্পনা Jan 31, 2026
img
খারাপ সময়ে বুঝেছি কে আপন, কে পর : নুসরাত ফারিয়া Jan 31, 2026
img
অভিনেত্রী আলিনা আমিরের আপত্তিকর ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে কী জানা গেল! Jan 31, 2026
img
কঙ্গনার ফিরিয়ে দেওয়া সিনেমায় বদলে যায় বিদ্যা বালানের ভাগ্য Jan 31, 2026
img
মুন্সিগঞ্জ বিএনপিতে একসঙ্গে ৬৭ নেতার গণপদত্যাগ Jan 31, 2026
img
যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে ছুরিকাঘাত, স্বামী আটক Jan 31, 2026
img
গোপালগঞ্জে আনসার ব্যাটালিয়ান কার্যালয়ে ককটেল হামলা Jan 31, 2026
img
পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর পৃথক অভিযানে ৪১ সন্ত্রাসী নিহত Jan 31, 2026
img
জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে মানুষ লাল কার্ড দেখাবে: আবিদুল ইসলাম Jan 31, 2026
img
মেধা ও যোগ্যতা থাকলে রিকশাওয়ালাও রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারবে: জামায়াত আমির Jan 31, 2026
img
ওয়ারী পাস্তা ক্লাবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত ৮ Jan 31, 2026
img
শতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে বিএনপি নেতা মাহাবুবের জামায়াতে যোগদান Jan 31, 2026
img
কুমিল্লায় বিভাগ ও বিমানবন্দর হবে : জামায়াত আমির Jan 31, 2026
img
হজযাত্রীদের ভিসা আবেদন নিয়ে নতুন নির্দেশনা Jan 31, 2026
img
যাদের কারণে জেল থেকে মুক্তি, দেশে ফেরা তাদেরকে অস্বীকার করছেন, প্রশ্ন জামায়াত আমিরের Jan 30, 2026
img
বিশ্বকাপের বাইরে থাকা দল নিয়ে লিটনদের নতুন টুর্নামেন্ট Jan 30, 2026