স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরায় একটি ঐতিহাসিক কবরস্থানে দার্শনিক ডেভিড হিউমের সমাধি ও আরও দুটি স্মৃতিস্তম্ভে রহস্যজনক ও ভীতিকর চিহ্ন এঁকে ভাঙচুর করা হয়েছে।
ওল্ড ক্যালটন সমাধিস্থলে একজন ট্যুর গাইড প্রথম এ বিষয়টি দেখতে পান বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। সেখানে পাওয়া চিহ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে- একজন নগ্ন নারী একটি শিশুর দিকে রক্তমাখা ছুরি তাক করে আছে; শিশুটির গলায় ফাঁসির দড়ি জড়ানো। এ ছাড়া ডেভিড হিউমের সমাধিসৌধ এবং পাশের দুটি স্মৃতিস্তম্ভে লাল রঙা বৈদ্যুতিক টেপ দিয়ে সাংকেতিক কিছু বার্তা সাঁটা ছিল।
সেই ট্যুর গাইড সমাধিস্থলে ক্ষয়ক্ষতির ছবি এডিনবরার কাউন্সিলকে ই-মেইল করেন এবং চিহ্নগুলোকে ‘শয়তানের সংকেত’ বলে অভিহিত করেন।
টেলিগ্রামের একটি গ্রুপ, যারা বিভিন্ন সমাধিস্থলে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেদের দায়ী বলে দাবি করে, তারা একটি চ্যানেলে এই ক্ষয়ক্ষতির ছবি পোস্ট করেছে; যা পরে মুছে ফেলা হয়। তারা আরও কিছু বিচলিত করার মতো ছবি শেয়ার করে, যার একটিতে দেখা যায়-একজন নগ্ন নারী একটি শিশুর রক্তমাখা মাথা ধরে আছে। সেই পোস্টে একজন সদস্য মন্তব্য করেন, ‘EH1-এর জন্য?’
উল্লেখ্য, EH1 হলো এডিনবরার ঐতিহাসিক ওল্ড টাউন এলাকার পোস্ট কোড।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, টেলিগ্রামের গ্রুপটি ওল্ড ক্যালটন সমাধিস্থলে পাওয়া কিছু অদ্ভুত সরঞ্জামের ছবিও পোস্ট করেছে; যার মধ্যে ছিল লাল মোমবাতির ভেতর দিয়ে গেঁথে দেওয়া পেরেক, চকের আঁকা প্রতীক এবং লাল টেপ যাতে ‘অ্যান্টি মেটা ফিজিক্যাল ফ্রন্ট’ কথাটি লেখা আছে।
এডিনবরার কাউন্সিল জানিয়েছে, ওই এলাকায় কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। আর ক্ষয়ক্ষতিগুলো স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি না হওয়ায় বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়নি।
কাউন্সিলের সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়-বিষয়ক আহ্বায়ক মার্গারেট গ্রাহাম বলেন, ‘আমাদের ঐতিহাসিক ওল্ড ক্যালটন সমাধিস্থল এভাবে বিকৃত করায় আমি স্তম্ভিত। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের কর্মকর্তারা তা অপসারণ করেন এবং এর পর থেকে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’
সেই ট্যুর গাইডের রিপোর্টটি ‘তথ্য অধিকার’ আবেদনের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসে, যা প্রথম প্রকাশ করে দ্য স্কটসম্যান পত্রিকা।
গত ১৯ নভেম্বরের সেই ই-মেইলে গাইড লেখেন, ‘যদি বিষয়টি আপনাদের নজরে না এসে থাকে, তাহলে জানাই, আজ ওল্ড ক্যালটন সমাধিতে পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখানোর সময় ডেভিড হিউমের সমাধিতে বিচলিত হওয়ার মতো কিছু অতিপ্রাকৃত সরঞ্জাম দেখতে পাই। আমি যতটা সম্ভব সরিয়েছি, কিন্তু পর্যটকদের কারণে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। আপনারা দ্রুত কাউকে সেখানে পাঠালে ভালো হয়। মূল কাঠামোটিতেও কিছু শয়তানি প্রতীক আঁকা ছিল।’
ডেভিড হিউম অষ্টাদশ শতাব্দীর স্কটিশ দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক। তিনি অভিজ্ঞতাবাদ, দার্শনিক সংশয়বাদ এবং মেটাফিজিক্যাল ন্যাচারালিজমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা তাঁর প্রভাবশালী দার্শনিক তত্ত্বের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
‘এ ট্রিটিজ অব হিউম্যান নেচার’ গ্রন্থের মাধ্যমে হিউম মানুষের স্বভাবের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নির্মাণের চেষ্টা করেন।
আরেক দার্শনিক জন লকের অনুসরণে হিউম জন্মগত ধারণার অস্তিত্ব প্রত্যাখ্যান করেন এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান, মানুষের সব জ্ঞান কেবল অভিজ্ঞতা থেকেই উৎসারিত। এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাঁকে ফ্রান্সিস বেকন, টমাস হবস, জন লক ও জর্জ বার্কলির মতো অভিজ্ঞতাবাদী চিন্তাবিদদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
হিউমের সমাধিস্থলটি ‘এ ক্যাটাগরির’ ঐতিহ্যবাহী স্থান। সেখানে বিজ্ঞানী জন প্লেফেয়ার, চিত্রশিল্পী ডেভিড অ্যালানসহ বিশিষ্ট স্কটিশ ব্যক্তিদের সমাধি রয়েছে। হিউমের এই সমাধিসৌধ স্থপতি রবার্ট অ্যাডামের নকশা করা।
এসকে/টিকে