জাহানারা আলমের উত্থাপিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছে জমা দিয়েছে। থিসিস পেপারের আদলে বাঁধাই করা দুটি বই আকারে প্রস্তুত করা এই তদন্ত প্রতিবেদন গত পরশু বিসিবিতে পৌঁছায়। তবে তদন্ত শেষ হলেও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের অভিযোগের পর তদন্ত শেষ হলেও থেকে গেছে অনেক প্রশ্ন!
নারী ক্রিকেট দলের সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের ৮ নভেম্বর বিসিবি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রাথমিকভাবে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে সময় বাড়িয়ে ২০ ডিসেম্বর করা হয়। একাধিক দফা বিলম্বের পর দীর্ঘ সময় শেষে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ায় বিসিবির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ।
ব্যারিস্টার নাসির বলেন, ‘বিসিবি তাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে আপনি যেটা বললেন, আদালতের একটা আদেশ হবার পরে তখন তারা (বিসিবি) প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তারা হয়তো সেটা গা বাঁচানোর জন্য করে থাকতে পারেন, যেটা আমি মনে করি। কারণ, এই প্রতিবেদনটা যদি পাঁচ সদস্যের কমিটির হয়ে থাকে, তাহলে তো আপনি স্বাক্ষীদের ডাকবেন। যিনি অভিযোগ করেছেন, তাঁকে ডাকবেন। তাহলে বিসিবির এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণটা কী ছিল? এটা তো অনেক আগেই তারা করতে পারতেন।’
তিনি মনে করেন, তদন্তে যদি কেউ দোষী প্রমাণিত হয়ে থাকেন, তাহলে অনেক আগেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল। এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার নাসির বলেন, ‘দেখুন, এই অভিযোগ নিয়ে তাদের তো তদন্ত আরও আগে এবং কেউ যদি দোষী থেকে থাকেন, তাহলে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা আগেও নিতে পারতেন। আর আমি যেটা প্রথমেই বলেছি আপনাদের, মঞ্জুর আলম (মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর) নামের ভদ্রলোককে যাকে আগেই বরখাস্ত করা হয়েছিল, বরখাস্ত করার পরের দিন আবার তাঁকে সেই পদে পুনর্বহাল করা হয়েছে।’
তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার প্রচলিত রীতির কথাও তুলে ধরেন এই আইনজীবী। জাহানারা আলমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিসিবির ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখুন, অন্য একটা ঘটনায় একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। তাঁকে বরখাস্ত করলেন। বরখাস্ত করার পরের দিন সেই পদে আবার বসালেন। মূলত যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে, যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে, তখন কিন্তু দেখা গেছে তদন্তের স্বার্থে বা নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে তাকে মুলতুবি রাখা হয় কোনো একটা বিষয় থেকে। কিন্তু সে জায়গাতে বিসিবির যে ভূমিকা, এটা আমার মনে হয় বাংলাদেশের জনগণ, ক্রিকেট তো আমাদের গর্বের জায়গা এবং নারী ক্রিকেটারদের যে বিষয়টা, দেখা গেছে পুরুষদের চেয়েও নারী ক্রিকেটাররা দুর্দান্ত খেলছেন।’
জাহানারা ইস্যুতে গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তারিক উল হাকিম। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিসিবির নারী বিভাগের প্রধান রুবাবা দৌলা এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা। তবে কমিটির কাঠামো নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন ব্যারিস্টার নাসির।
গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ করলেও বিসিবির মতো একটা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আছে এই বিষয়টা যখন পত্রপত্রিকায় এসেছে, আন্তর্জাতিকভাবে জাতীয় পত্রপত্রিকায় এসেছে, তখন আরও আগেই বিসিবি তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারত। বিসিবি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে, যেখানে বলা আছে পাঁচ সদস্যের কমিটির কথা। যে কথাটা হচ্ছে, অভিযোগ গঠনকারী যে কমিটি, এটা সব সময় একটা স্ট্যান্ডিং কমিটি হিসেবে থাকবে। একটা অভিযোগ হলো আর তদন্ত কমিটি করলেন, ব্যাপারটা তা না। স্বচ্ছতার কারণে তদন্ত প্রতিবেদন বিসিবিকে প্রকাশ করতে হবে।’
জাহানারা আলমের অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই বিসিবির আরেকটি কার্যক্রমের ঘোষণাও সামনে এসেছে। বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান খালেদ মাসুদ পাইলট জানিয়েছেন, খুলনা, বরিশাল, কক্সবাজার, বগুড়া, রাজশাহী, ফতুল্লা, বিকেএসপি এবং পূর্বাচলসহ দেশের বিভিন্ন মাঠে মোট ১৩৭টি উইকেট তৈরি করা হবে। শিগগিরই এসব উইকেট নির্মাণের কাজ শুরু হবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
ইউটি/টিএ