ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কখনোই জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত ছিলেন না। তবুও এপস্টেইন কেলেঙ্কারির কারণে তিনি আজ তার ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে আছেন।
আটলান্টিকের পূর্ব পারে যখন রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের দাবিতে ওয়াশিংটনের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বৈপরীত্যটি মূলত ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তি এবং স্টারমারের সম্ভাব্য অস্তিত্বগত দুর্বলতার পার্থক্যই তুলে ধরে।
এতে স্পষ্ট হয় যে যুক্তরাজ্যে জবাবদিহি ও তদন্তের জন্য নিবেদিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে কাজ করছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিচার বিভাগে নিয়ন্ত্রণ এবং রিপাবলিকান কংগ্রেসের ওপর তার দৃঢ় দখল তাকে কঠোর নজরদারি থেকে রক্ষা করছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এপস্টেইন নথির বৈশ্বিক বিস্তার যা এখন নরওয়ে ও পোল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে; সেটি প্রমাণ করে যে এই কেলেঙ্কারির প্রভাব কতটা গভীর ও বিস্তৃত। এটা শুধু স্টারমার নন, আরো অনেকে এই উত্তাপে পুড়ছেন।
যুক্তরাজ্যে এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জনরোষ এতটাই তীব্র যে, রাজা তৃতীয় চার্লস তার নিজের ভাই, সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু (এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু)–কে রাজকীয় উপাধি থেকে বঞ্চিত করেছেন এবং উইন্ডসর ক্যাসেল প্রাসাদের একটি বাসভবন থেকেও তাকে সরিয়ে দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে এমন কোনো উদাহরণ দেখা যায়নি যে, এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কেউ পার পেয়ে গেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে কারাগারে বিচার শুরুর আগেই এপস্টেইনের মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল।
এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছেন সাবেক মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ল্যারি সামার্স। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট গত বছর জনসম্মুখের কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ান।
কারণ, এপস্টেইনের সঙ্গে তার ইমেইল প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করেছিলেন এবং প্রেমসংক্রান্ত পরামর্শ চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিনি গভীরভাবে লজ্জিত।
অন্যদিকে ট্রাম্প এই বিতর্ক পেছনে ফেলতে মরিয়া। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, আর কোনো নতুন মামলা হবে না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ নেই এবং নতুন করে প্রকাশিত নথিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
যদিও এপস্টেইন নথিতে ট্রাম্পের কিছু উল্লেখ নিরীহ, তবে সেখানে নতুনভাবে প্রকাশ পাওয়া, যাচাই না হওয়া যৌন নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে, পাশাপাশি এপস্টেইনের ভুক্তভোগীরা ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা কীভাবে বর্ণনা করেছিলেন তারও কিছু বিবরণ আছে।
তবে ট্রাম্প এই সপ্তাহে সিএনএনকে বলেন, ‘দেশের এখন অন্য কিছুর দিকে এগোনোর সময় এসেছে।’
তবে বিপদে পড়েছেন যুক্তরাজ্যে স্টারমার। বৃহস্পতিবার সকালে তার প্রধানমন্ত্রীত্ব কার্যত সুতোয় ঝুলছিল। লেবার পার্টির এমপিদের বিদ্রোহ ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটকে আরো বিপর্যস্ত করে তোলে, যা একের পর এক সংকটে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
বুধবার উত্তপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে স্টারমার স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসন ও এপস্টেইনের বন্ধুত্বের কথা তিনি জানতেন, তবু তাকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
গত বছর এপস্টেইন নথির আগের প্রকাশনায় দেখা যায়, ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। তখনই স্টারমার তাকে বরখাস্ত করেন।
কিন্তু নতুন করে প্রকাশিত নথিতে ইঙ্গিত মিলেছে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় ম্যান্ডেলসন হয়তো গোপন এপস্টেইনের কাছে পাচার করেছিলেন। এই তথ্য এপস্টেইন ও তার ওয়াল স্ট্রিট সহযোগীদের জন্য অমূল্য হতো। এখন ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত চলছে। তিনি হাউস অব লর্ডস ও লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন।
স্টারমার সংসদে বলেন, ম্যান্ডেলসন আমাদের দেশ, আমাদের সংসদ এবং আমার দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
গত মাসে বিবিসিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য ক্ষমা চান। তিনি বলেন, দণ্ডিত হওয়ার পরও তাকে বিশ্বাস করা এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ছিল আমার ভুল। এতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেসব নারী ও কিশোরীদের কাছে আমি নিঃশর্তভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।
এই সপ্তাহে তিনি জানান, ‘দলকে আরো বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচাতে তিনি লেবার পার্টি ছাড়ছেন।’ তবে স্টারমারের ক্ষোভ আসলে ব্যাখ্যা করে না, কেন এপস্টেইন–সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া যুক্তরাজ্যে ওয়াশিংটনের তুলনায় এত বেশি তীব্র।
এর কারণ হলো, ব্রিটেনে যে ঝড় বইছে, তা শুধু এপস্টেইনের যৌন পাচার ও নির্যাতনের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক কেলেঙ্কারি, যা ব্রিটিশ রাজনীতি, গণমাধ্যম ও জনজীবনে আগে থেকেই চলমান তিনটি বড় নাটককে আরো উসকে দিচ্ছে।
এটি এমন এক প্রধানমন্ত্রীর গল্প, যিনি ভূমিধস জয় দিয়ে ক্ষমতায় এলেও দুই বছরেরও কম সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। বুধবার সংসদে তার বিব্রতকর উপস্থিতি তাকে দুর্বল নেতার প্রতীকে পরিণত করেছে এবং লেবার পার্টির ভেতরে নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের গুঞ্জন জোরালো করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে প্রেসিডেন্টরা নির্দিষ্ট মেয়াদে ক্ষমতায় থাকেন, সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ বোঝা কঠিন।
ডাউনিং স্ট্রিটের কালো দরজা দিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ওয়েস্টমিনস্টারে জল্পনা শুরু হয় তিনি কতদিন টিকবেন। গত ১১ বছরে যুক্তরাজ্য পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী বদলেছে; যা একসময় স্থিতিশীলতার প্রতীক দেশটিকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঠেলে দিয়েছে।
এপস্টেইন কাহিনি আরো যুক্ত হয়েছে পিটার ম্যান্ডেলসনের ৩০ বছরের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডিতে। ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ নামে পরিচিত এই দক্ষ কিন্তু দুর্ভাগা রাজনীতিবিদ বারবার নিজের পতনের জন্য দায়ী হয়েছেন। ধনী, প্রভাবশালী ও খ্যাতিমান মহলে মিশতে তার প্রবল আকাঙ্ক্ষাই তাকে কেলেঙ্কারির পথে ঠেলে দেয় যার চূড়ান্ত পরিণতি এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব।
সূত্র : সিএনএন।
এমকে/এসএন