জাতিসংঘের বকেয়া মেটাতে শীঘ্রই প্রথম কিস্তি দেবে যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘদিনের বকেয়া নিয়ে টানাপোড়েনের পর অবশেষে জাতিসংঘকে টাকা দেয়ার পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বড় অঙ্কের একটি প্রাথমিক কিস্তি দেবে ওয়াশিংটন- এমনটাই জানালেন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ।

শুক্রবার (৬ ডিসেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ওয়াল্টজ বলেন, খুব শিগগিরই একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ দেয়া হবে। এটি হবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক চাঁদার প্রথম বড় কিস্তি। কত টাকা দেয়া হবে, সেই অঙ্ক এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে সময় বেশি লাগবে না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

 জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত বাজেট বাবদ যে অর্থ এখনও পরিশোধ হয়নি, তার ৯৫ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রের দেনা। ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত এই বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া আরও ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের জন্য বাকি আছে ৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলার।
 
এই পরিস্থিতিতে গত মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, বকেয়া অর্থ না পেলে সংস্থাটি ‘আসন্ন আর্থিক সংকটে’ পড়তে পারে। এমনকি জুলাইয়ের মধ্যেই নগদ অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও জানান তিনি।
 
এর মধ্যেই ৩০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৬ সালের জন্য ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের নিয়মিত বাজেট অনুমোদন দেয়। এই বাজেট দিয়ে নিউইয়র্ক সদর দফতরসহ বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের দফতর পরিচালনা, কর্মীদের বেতন, বৈঠক, উন্নয়ন ও মানবাধিকার কার্যক্রম চালানো হয়।
 
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই আর্থিক সংকটের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বহুপাক্ষিক উদ্যোগ থেকে সরে আসার নীতি। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আমলে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া দ্রুত বেড়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের চাঁদা দিতে দেরি করার ইতিহাস অনেক পুরোনো।
 
জাতিসংঘ সূত্র জানায়, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত বাজেটে এক টাকাও দেয়নি। ফলে শুধু ওই বছরের জন্যই বকেয়া জমেছে প্রায় ৮২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০২৬ সালের জন্যও বাকি আছে আরও ৭৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
 
এদিকে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ট্রাম্প একটি ব্যয় বিল আইনে স্বাক্ষর করেন, যেখানে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার চাঁদা হিসেবে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই টাকা ঠিক কোন খাতে যাবে- পুরোনো বকেয়া নাকি নতুন বছরের চাঁদা- এই প্রশ্নে ওয়াল্টজ বলেন, মূল লক্ষ্য হলো বকেয়া কমানো। একই সঙ্গে জাতিসংঘে যে সংস্কারের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, সেটিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
 
ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিয়মিত ও শান্তিরক্ষা বাজেটেই নয়, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় স্বেচ্ছা অনুদানও কমিয়েছে। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ কয়েকটি জাতিসংঘ সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নেয়।
 
ওয়াল্টজ জানান, মহাসচিব গুতেরেসের নেয়া ‘ইউএন ৮০’ সংস্কার পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। তবে তার মতে, এটি এখনও যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, সংস্কার আরও আগে হওয়া উচিত ছিল।
 
তার ভাষায়, “এটা এক ধরনের কঠোর ভালোবাসা। বর্তমান কাঠামো অনেক দেশের জন্য টেকসই নয়। জাতিসংঘকে আবার মূল কাজে ফিরতে হবে- শান্তি আর নিরাপত্তায়।”
 
তিনি বলেন, একই কাজের জন্য একাধিক সংস্থা থাকায় অকারণে খরচ বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছে এমন সাতটি জাতিসংঘ সংস্থা আছে। এতগুলো দরকার নেই। ত্রাণ সংস্থাগুলোর প্রশাসনিক কাজও এক জায়গায় আনার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র।
 
মহাসচিব গুতেরেস গত বছর ইউএন ৮০ সংস্কার পরিকল্পনা চালু করেন, যার লক্ষ্য ব্যয় কমানো ও কাজের গতি বাড়ানো। ২০২৬ সালের অনুমোদিত বাজেট তার প্রস্তাবের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম।
 
গুতেরেস আরও জানান, একটি জটিল নিয়মের কারণে জাতিসংঘকে প্রতি বছর অব্যবহৃত অর্থ সদস্য দেশগুলোকে ফেরত দিতে হয়, এমনকি সেই টাকা হাতে না পেলেও। ওয়াল্টজ বলেন, এই নিয়ম বদলানো জরুরি।
 
শান্তিরক্ষা মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘ যে হারে টাকা চায় আর যুক্তরাষ্ট্রের আইনে যে পরিমাণ দেয়া যায়- এই দুইয়ের মধ্যে গরমিল আছে। আগামী বছর এই হার নিয়ে আলোচনা হলে বিষয়টি মিটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
 
সব মিলিয়ে, সংস্কারের চাপ আর বকেয়া পরিশোধ- এই দুইয়ের মধ্যেই নতুন পথে হাঁটতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ। এখন দেখার বিষয়, এই প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়।
 
তথ্যসূত্র: রয়টার্স

পিআর/এসএন 

Share this news on:

সর্বশেষ

img
তারেক রহমানের পক্ষে গুলশানে নির্বাচনী গণসংযোগে জাইমা রহমান Feb 07, 2026
img
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে নাটকীয়তায় পাকিস্তানের জয় Feb 07, 2026
img
যমুনায় আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত জরুরি সভা আজ, থাকবেন বাহিনী প্রধানরা Feb 07, 2026
img
সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যুতে মির্জা ফখরুলের শোক Feb 07, 2026
img
হাসপাতালে ভর্তি অভিনেত্রী নবনীতা, ঠিক কী হয়েছে তার? Feb 07, 2026
img
পাক-ভারত ম্যাচ নিয়ে শ্রীলঙ্কার অনুরোধে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে পিসিবি Feb 07, 2026
img
ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে পিছিয়ে বাংলাদেশ Feb 07, 2026
img
একটি দল জাল ভোট দিতে বোরখা ও নিকাব প্রস্তুত করছে : মাহদী আমিন Feb 07, 2026
img
লাল পাসপোর্ট ছেড়ে দিয়েছেন ফারুকীসহ একাধিক উপদেষ্টা Feb 07, 2026
img
তারুণ্যের ভাবনাকে আমরা ধারণ করি, মেধানির্ভর বাংলাদেশ গড়ব: সালাহউদ্দিন আহমদ Feb 07, 2026
img
ক্ষমতায় গেলে যত দ্রুত সম্ভব তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে: তারেক রহমান Feb 07, 2026
img
১৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’- এর প্রথম বৈঠক Feb 07, 2026
img

রেডিও ব্ল্যাকআউটের আশঙ্কা

পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী সৌরঝড় Feb 07, 2026
img
কালো টাকা দিয়ে কারাগার থেকে সন্ত্রাসী ছাড়িয়ে আনা হচ্ছে: গোলাম পরওয়ার Feb 07, 2026
img
পিএসএলের নিলামে ৫০ বাংলাদেশি Feb 07, 2026
img
বিশ্ব তাকিয়ে আছে, নির্বাচন ব্যর্থ হলে অজুহাত চলবে না : চট্টগ্রামের ডিসি Feb 07, 2026
img
সিলেটে পৌঁছেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান Feb 07, 2026
img
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সব একাডেমিক সম্পর্ক ছিন্ন করছে পেন্টাগন Feb 07, 2026
img
সুরের জগতে এক জীবন্ত কিংবদন্তি কে. এস. চিত্রা Feb 07, 2026
img
একটি দল ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে : মাহদী আমিন Feb 07, 2026