সংসদের মেয়াদ হোক পাঁচ বছর, বিএনপি

জাতীয় সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়াই সমীচীন মনে করে বিএনপি। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করার বিধান চায় না দলটি। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি যে রাজনৈতিক দলের প্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন না, এটাতেও বিএনপি একমত না। কারণ, এটি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের বিষয় বলে মনে করে দলটি। আইনসভার নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হওয়ার বিধানের সঙ্গেও একমত নয়। তবে সংসদের দুজন ডেপুটি স্পিকারের মধ্যে একজন বিরোধী দল থেকে মনোনীত করায় দলটি একমত। একই সঙ্গে উচ্চকক্ষের একমাত্র ডেপুটি স্পিকার সরকারি দলের বাইরে থেকে নির্বাচিত হোক, সেটাও চায় বিএনপি।

গত রোববার (২৪ মার্চ) জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে জমা দেওয়া সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ওপর বিএনপির দেওয়া মতামত পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে। ওইদিন সংবিধান কমিশনসহ পাঁচ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ওপর মতামত জমা দেয় দলটি।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ওপর বিএনপির দেওয়া মতামত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রস্তাবনার আইনসভা অংশে বিএনপি নীতিগতভাবে একমত হয়েছে যে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট একটি আইনসভা থাকবে। তবে উভয় কক্ষের (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ) মেয়াদ চার বছর করার যে সুপারিশ করা হয়েছে, সেখানে বিএনপি বলেছে, মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়া সমীচীন হবে।

প্রস্তাবনার সংবিধান সংশোধনী অংশে সংবিধানের যে কোনো সংশোধনী উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদন এবং গণভোটে করার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি এতে একমত নয়। দলটি বলেছে, সংবিধানের সব সংশোধনী গণভোটে উপস্থাপন বাস্তবসম্মত নয়। এ ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ১৪২কে পঞ্চদশ সংশোধনী-পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া বিল উচ্চকক্ষ সুপারিশসহ কিংবা সুপারিশ ব্যতিরেকে পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠাতে পারবে—এরূপ বিধান করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে নির্বাচিত সংসদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে উক্ত সংস্কার বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

সুপারিশে রাষ্ট্রপতি অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ হবে চার বছর। রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি অধিষ্ঠিত থাকবেন না। এই প্রস্তাবনার সঙ্গে একমত না হওয়া বিএনপি তাদের মতামতে বলেছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়া সমীচীন হবে। বিদ্যমান সংবিধানে সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত না থাকার বিধান (অনুচ্ছেদ ৫০(২) থাকায় এতদসংক্রান্ত সুপারিশ অপ্রয়োজনীয়।

প্রস্তাবনায় প্রধানমন্ত্রী অংশে বলা হয়েছে, আইনসভার নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হবে। এতে একমত নয় বিএনপি। দলটি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী পদে কোনো নির্বাচন হয় না বিধায় মনোনয়নের প্রশ্নটি অবান্তর।

প্রধানমন্ত্রী অংশে আরও বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ দুইবার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সুপাশিরকৃত এই বিধানের সঙ্গে একমত পোষণ না করা বিএনপি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সংক্রান্ত বিষয়ে ‘কোনো ব্যক্তি একাধিক্রমে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবেন না’—এরূপ বিধান করাই যথেষ্ট।

এই অংশে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী থাকাবস্থায় তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। এতে দ্বিমত পোষণ করে বিএনপি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী দলের প্রধান অথবা সংসদ নেতা পদে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তি অধিষ্ঠিত হবেন কি না, তা একান্তই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থি।

কমিশনের বিচার বিভাগের সুপ্রিম কোর্ট অংশে দেশের বিভাগে হাইকোর্ট বিভাগের সমান এখতিয়ারসম্পন্ন হাইকোর্টের স্থায়ী আসন প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। বিএনপি বলেছে, দেশের সব বিভাগে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী আসন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধায় এটি করার সুযোগ নেই। বিকল্প হিসেবে ঢাকার বাইরে অনুচ্ছেদ ১০০-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের সার্কিট বেঞ্চ স্থাপন করা যেতে পারে।

প্রস্তাবনায় আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদানকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের একটি বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি এই প্রস্তাবের সঙ্গে আংশিকভাবে একমত। দলটি বলেছে, ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’ বিবেচনায় রেখে প্রবীণতম তিনজন বিচারকের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে।

স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস অংশে সংবিধানের অধীন একটি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে একমত নয় বিএনপি। দলটি বলেছে, স্থায়ী প্রসিকিউশন সার্ভিসের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা আইনের মাধ্যমে ও পর্যায়ক্রমে হওয়া সমীচীন।

সাংবিধানিক কমিশনসমূহ অংশে বলা হয়েছে, পাঁচটি সাংবিধানিক কমিশন নিয়ে সংবিধানের একটি ভাগ তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি কমিশনের জন্য একটি করে পরিচ্ছেদ থাকবে। এই কমিশনগুলো হচ্ছে—মানবাধিকার কমিশন; নির্বাচন কমিশন; সরকারি কর্ম কমিশন; স্থানীয় সরকার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন। সব কমিশনের গঠন, নিয়োগ, কার্যকাল এবং অপসারণ প্রক্রিয়া একই রকম হবে। প্রতিটির মেয়াদ হবে চার বছর। এই প্রস্তাবনার সঙ্গে একমত না হওয়া বিএনপি বলেছে, এরই মধ্যে আইনের দ্বারা গঠিত কমিশনসমূহকে (মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন) নতুন করে সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় আনলে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বিস্তর আইনি জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় সরকার কমিশন সংবিধানের মাধ্যমে না করে স্বতন্ত্র আইনের মাধ্যমে করা অধিক সমীচীন। এতে করে যে কোনো প্রায়োগিক জটিলতা দ্রুত সমাধান করা যাবে।

বিদ্যমান সাংবিধানিক কমিশনসমূহের (নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন) মেয়াদ পরিবর্তনের আবশ্যকতা নেই।

‘বিবিধ’ অংশে বলা হয়েছে, কেবলমাত্র এনসিসির সিদ্ধান্তক্রমে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন। জরুরি অবস্থার সময় নাগরিকদের কোনো অধিকার রদ বা স্থগিত করা যাবে না এবং আদালতে যাওয়ার অধিকার বন্ধ বা স্থগিত করা যাবে না। তাই অনুচ্ছেদ ১৪১(খ) এবং অনুচ্ছেদ ১৪১(গ) বাতিল হবে। এই প্রস্তাবনার সঙ্গে একমত নয় বিএনপি। দলটি বলেছে, জরুরি অবস্থা জারির সঙ্গে সরকারের নির্বাহী কর্তৃত্বের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তাই এতদসংক্রান্ত ক্ষমতা সরকার ও সংসদের বাইরে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা সংগত নয়। নাগরিকদের কোনো অধিকার রদ বা স্থগিত না করে জরুরি অবস্থা জারির কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, প্রস্তাবিত সুপারিশে তা বোধগম্য নয়।

প্রস্তাবনায় সংবিধানের মূলনীতি অংশে বলা হয়েছে, কমিশন নিম্নোক্ত বিধান অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করছে। ‘বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী, বহু-জাতি, বহু-ধর্মী, বহু-ভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ, যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।’ অন্যদিকে রাষ্ট্রের মূলনীতি অংশে সংবিধানের মূলনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ এবং এ-সংশ্লিষ্ট সংবিধানের ৮, ৯, ১০ ও ১২ অনুচ্ছেদগুলো বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে একমত নয় বিএনপি। দলটি বলেছে, অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০ ও ১২-কে পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

সুপারিশে ‘মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা’ অংশে বিদ্যমান অধিকারের অনুচ্ছেদসমূহের সংস্কার যেমন—বৈষম্য নিষিদ্ধকরণের সীমিত তালিকা বর্ধিতকরণ, জীবনের অধিকার রক্ষায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, জামিনে মুক্তির অধিকার অন্তর্ভুক্তকরণ এবং নিবর্তনমূলক আটক সংক্রান্ত বিধান বিলুপ্তির কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে দ্বিমত জানিয়ে বিএনপি বলেছে, প্রস্তাবিত সুপারিশ অপ্রয়োজনীয়। বিদ্যমান সংবিধানেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম থেকে সুরক্ষা এবং শারীরিক অখণ্ডতা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রক্ষার বিষয়টি স্বীকৃত (অনুচ্ছেদ ৩২)।


Share this news on: