মিয়ানমারে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পাঁচদিন পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।দেশটির ফায়ার সার্ভিস ও সামরিক জান্তার বরাতে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর একটি হোটেলের ধ্বংসস্তূপ থেকে বুধবার মিয়ানমার ও তুরস্কের যৌথ উদ্ধারকারী দল ২৬ বছরের এক যুবককে জীবিত উদ্ধার করে।
মিয়ানমারে গত শুক্রবার ১২ মিনিটের ব্যবধানে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ ও ৬ দশমিক ৪ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, প্রথম কম্পনটি স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে অনুভূত হয়, যার উৎস ছিল মিয়ানমারের সাগাইং শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ভূ-পৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। প্রথম ভূমিকম্পটি অনুভূত হওয়ার ১২ মিনিট বাদে দ্বিতীয় কম্পনটি অনুভূত হয়।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের দুই দফার ভূমিকম্পে দেশজুড়ে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ৪ হাজার মানুষ। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক মানুষ চাপা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
মিয়ানমারের মান্দালয়ে এভাবে ধসে পড়েছে বহু স্থাপনা।
শুক্রবারের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মিয়ানমারের অনেক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অনেক মসজিদ, মন্দির, সেতুসহ অনেক স্থাপনা ধসে পড়েছে। অনেক এলাকায় সড়কও ভেঙে গেছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মান্দায়ল ও সাগাইং শহর, যেখানে অনেক ঘরবাড়ি ধসে পড়ায় লোকজনকে রাস্তায় ঘুমাতে হচ্ছে। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মৃতদেহের গন্ধ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে পানি, খাবার ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা দেওয়া সংগঠনগুলো জরুরি ভিত্তিতে মিয়ানমারে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
মানবিক সংস্থা কেয়ারের মিয়ানমারের কান্ট্রি ডিরেক্টর আরিফ নূর বলেন, “শুক্রবার ভূমিকম্পের বিধ্বংসী প্রভাব প্রতি ঘণ্টায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি মিয়ানমারের জন্য একটি সংকটের ওপর আরেকটি সংকট, যেখানে মানবিক পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই ভয়াবহ।”
তিনি বলেন, “উদ্ধারকারী দল এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করছে এবং হাসপাতালগুলো আহতদের ভিড়ে উপচে পড়ছে। এই বিপর্যয়ের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত কয়েক দশক ধরে থাকবে।”
শুক্রবার শক্তিশালী ভূমিকম্পটি ৫ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দরিদ্র দেশটির জন্য সর্বশেষ আঘাত হয়ে এসেছে। দেশটি ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত, যা এক দশকের উন্নয়ন ও অস্থায়ী গণতন্ত্রের পর অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।মিয়ানমারের অনেক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফেন ডুজারিক বলেছেন, “আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগে আমাদের দ্রুত ত্রাণ সরবরাহ করতে হবে। অন্যথায় এই ভয়াবহ সংকট আরও খারাপের দিকে যাবে।”
মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে এবং ৪৪১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
তিনি এক ভাষণে বলেন, “নিখোঁজদের মধ্যে বেশিরভাগই মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।”কিছু সংস্থা বলছে, অনানুষ্ঠানিক মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
এদিকে, ভূমিকম্পে মৃতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে মিয়ানমারে জাতীয়ভাবে শোক পালন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশটির সরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
এমআর/এসএন