জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘তথাকথিত’ বলে ধৃষ্টতা দেখানো আদালত অবমাননার শামিল: চিফ প্রসিকিউটর

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সো-কলড বা তথাকথিত বলে ধৃষ্টতা দেখানো আদালত অবমাননার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। 

রোববার (৩০ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। 

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে যেসব আইনসম্মত সংজ্ঞা বা উপায় আছে সেসব অবশ্যই করা যাবে। কিন্তু কোনো বিচারপ্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা তথা আজকের রাষ্ট্রটা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটা জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত আরেকটি বাংলাদেশ। সে মহান অর্জনের পেছনে ১৪০০ মানুষের রক্তদান, ২৫ হাজারের মতো মানুষের অঙ্গহানি ও অজস্র মানুষের চোখের পানি ঝরেছে। সেই মহান অভ্যুত্থান বা বিপ্লবকে সো-কলড বলা ধৃষ্টতা। এটা আদালত অবমাননা। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। এ ধরনের কথা আদালতে বলার অধিকার কোনো আসামিরই নেই।

তাজুল ইসলাম বলেন, এই ট্রাইব্যুনাল সংবিধানের অধীনে প্রতিষ্ঠিত আদালত। এই ট্রাইব্যুনালের আইনটি বিশেষ আইন ও সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। অতএব এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে দাঁড়িয়ে কোনো কথা বলার অধিকারই আসামির নেই। তবে আইনের পরিকাঠামোর মাধ্যমে যেসব অধিকার রয়েছে তা অবশ্যই পাবেন (আসামি)। অর্থাৎ নিজের পক্ষে সাক্ষ্য উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভুলত্রুটি চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। এসবের ব্যাপারে পাল্টা যুক্তিও দেওয়া যাবে। কিন্তু আইনকে বা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার অথরিটি বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের নেই।

এদিন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন বা বিচারের আদেশের বিরুদ্ধে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর রিভিউ আবেদনটি খারিজ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অন্য সদস্য হলেন জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

পরে ইনুর বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য সোমবার (১ ডিসেম্বর) দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। ইনুর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও আইনজীবী সিফাত মাহমুদ।

গত ২৭ নভেম্বর জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সো-কলড বলে বিচার শুরুর আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ করেন ইনু। তবে তার এমন মন্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল বলে আবেদনটি বাতিল চান প্রসিকিউশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনটি আজ খারিজ করেন ট্রাইব্যুনাল-২।

এর আগে, গত ২ নভেম্বর জাসদের এই সভাপতির বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। এছাড়া সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আজকের দিন নির্ধারণ করা হয়। ওই দিন আটটি অভিযোগই ইনুকে পড়ে শোনান বিচারক। একপর্যায়ে নিজেকে পুরোপুরি নির্দোষ দাবি করেন হাসানুল হক ইনু। ২৮ অক্টোবর ইনুর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। শুনানিতে কোনো অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে নিজের ক্লায়েন্টের অব্যাহতির আবেদন করেন তিনি। তবে ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতা হিসেবে কোনো দায় ইনু এড়াতে পারেন না বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। ২৩ অক্টোবর ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম।

চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর এ মামলায় ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ ছিল। ২৫ সেপ্টেম্বর এই জাসদ সভাপতির বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টে গণহত্যায় সহযোগিতাসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর শুনানিতে আটটি অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেন আদালত।

গত বছরের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই জাসদ নেতা। তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়ায় নিজ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান তিনি।

উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে কুষ্টিয়া শহরে শহীদ হন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। পরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। যাচাই-বাছাই শেষে উসকানি, ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। তার বিরুদ্ধে দেওয়া ফরমাল চার্জটি ৩৯ পৃষ্ঠা সম্বলিত। সাক্ষী করা হয়েছে ২০ জনকে। এছাড়া নথি হিসেবে তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও দিয়েছে প্রসিকিউশন।

কেএন/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
না ফেরার দেশে ভারতের বর্ষীয়ান সংগীতশিল্পী সমর হাজারিকা Jan 14, 2026
img
গণভোট ব্যক্তি নির্বাচনের জন্য নয়, আগামীর বাংলাদেশ গঠনের ভোট: আলী রীয়াজ Jan 14, 2026
img
আবারও বার্নাব্যুতে ফিরছেন মরিনহো? Jan 14, 2026
img
আলোচনায় রাফসানের সাবেক স্ত্রী সানিয়া এশা Jan 14, 2026
img
উদয়পুরের স্বপ্নের বিয়ের পর মুম্বাইতে জমকালো উৎসব নূপুর-স্টেবিনের Jan 14, 2026
img
প্রবাসী কর্মীদের জন্য নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে মালয়েশিয়া Jan 14, 2026
img
উৎসবের মৌসুমে মুক্তি, তবুও গতি পেল না রবি তেজার ছবি Jan 14, 2026
img
ঢাকামুখী না হয়ে বিকল্প শহরে কর্মসংস্থানের আহ্বান রিজওয়ানা হাসানের Jan 14, 2026
img
৭ দিন ধরে কথা বলতে পারছেন না শবনম ফারিয়া Jan 14, 2026
img
হঠাৎ কাতার ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কারণ কী? Jan 14, 2026
img
পোস্টাল ব্যালটের ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে: নজরুল ইসলাম Jan 14, 2026
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে পাকিস্তানে সিরিজ খেলবে অস্ট্রেলিয়া Jan 14, 2026
মালয়েশিয়ায় অবকাশ, আনন্দের মুহূর্ত Jan 14, 2026
ফোনকল-গুজবে অতিষ্ঠ তাহসান Jan 14, 2026
img
ব্যালটের ভাঁজে ‘ধানের শীষ’, কী জানালো ইসি? Jan 14, 2026
img
বাজারের বেশিরভাগ স্বর্ণই অবৈধ পথে আসছে: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান Jan 14, 2026
img
হামলা হলে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করবে ইরান Jan 14, 2026
img
ঋণ পরিশোধ করেছেন বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল, মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ Jan 14, 2026
img
স্পিনার রিশাদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের পরও হারল হোবার্ট Jan 14, 2026
img
সাগর সংরক্ষণ ও সামুদ্রিক মৎস্য রক্ষায় সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনের সঙ্গে মিডার এমওইউ সই Jan 14, 2026