বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, বিগত ১৫ বছরে পুলিশ দলীয় পুলিশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। নানান ধরনের বিচ্যুতি ছিল আমাদের মধ্যে এবং আমরা অনেক গণবিরোধী কাজ করেছি।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
আইজিপি বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসে যে দুঃখজনক ঘটনাগুলো ঘটেছে, বিপুল পরিমাণ আন্দোলনকারী প্রাণ দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। এইসব ঘটনার ফলে এবং পুলিশের যারা লোভী এবং দলকানা কিছু নেতৃবৃন্দ এবং সদস্যের কারণে আমাদের ওপরে যে দায়ভার এসেছে, এগুলো থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ পুলিশকে আবার স্বমহিমায় দাঁড় করানো, তাদের মনোবল বৃদ্ধি করে তাদেরকে আবার তাদের কাজে ফিরিয়ে আনা-এই গত এক বছরে আমরা এটা চেষ্টা করেছি। আমরা বলবো না আমরা শতভাগ সফল হয়েছি, তবে আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।
শতভাগ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কোনো জায়গায় করা যায় না দাবি করে পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এটা শতভাগ তো কোনো জায়গায় করে ফেলা যায় না। আমাদের দেশের গত ১০-১৫-২০ বছরের অপরাধ পরিসংখ্যান যদি নেন, প্রতি বছরই সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার হত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে। আমাদের অবশ্যই চেষ্টা থাকবে একজন লোকও যেন মারা না যায়। সেটা আমাদের লক্ষ্য। মানে এই স্ট্রাইভিং টুওয়ার্ডস পারফেকশন যেটা, এটা তো বজায় রাখতেই হবে। কিন্তু আমরা তো সবসময় সেটা পারি না, আমাদের এর মধ্যেও অনেক ধরনের ফেইলিওর থাকে, দুর্বলতা থাকে। এর মধ্যেই এরকম ঘটনা ঘটে যায়।
তিনি বলেন, আপনারা জানেন, শরীফ ওসমান হাদি মৃত্যু জাতিকে কিভাবে উদ্বেলিত করেছে। আমাদের ওপরে দায়ভার নিয়ে এসেছে এটার সুষ্ঠু সমাধান করার, বিচার করার। আমরা এই চেষ্টাটা করেই যাচ্ছি। খুলনা অঞ্চলে বেশ কিছু হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং তার অধিকাংশই আমরা ডিটেক্ট করা যেটা, এটা কিন্তু করতে পেরেছি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীদের উদ্বেগের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাহারুল আলম বলেন, অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা, নির্বাচনের উপযোগী রাখা এটা আমাদের দায়িত্ব। এবং এখানে শুধু পুলিশ, বাংলাদেশ পুলিশ একা না, এখানে পুলিশের সঙ্গে নির্বাচনের দিন তো বিপুল পরিমাণ, ৬ লক্ষের মতো আনসার সদস্য থাকবেন। আর এখন নির্বাচনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী আমাদের সঙ্গে আছেন। বর্ডার গার্ড আছেন, ইভেন কোস্ট গার্ড এবং নেভি উপকূলীয় অঞ্চলে তারাও এখন আইনশৃঙ্খলা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।
ডেভিল হান্ট অপারেশন প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, আপনারা জানেন, ১৩ ডিসেম্বর থেকে আমরা অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২ শুরু করেছি। এ ব্যাপারে আমাদের অনেক সমালোচনাও আছে। অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, অনেক প্রার্থী তারা বলছেন যে, আপনার পুলিশ আমার কর্মীকে অ্যারেস্ট করছে, আমার তো নির্বাচনে কাজ করতে পারছি না। আমরা চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব অবজেক্টিভলি কাজ করতে। এখন যিনি পটেনশিয়ালি একজন রিস্কি, মানে থ্রেট, যিনি পটেনশিয়াল থ্রেট ফর দি ইলেকশন-আমরা চেষ্টা করছি তাকে আইনের আওতায় আনতে, তাকে গ্রেপ্তার করতে। অথবা যদি তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা থেকে থাকে যেই মামলায় তিনি আসলেই অপরাধী। যদি অপরাধী না হন আমরা আগেই বলেছি, গত এক বছর ধরেই বলছি, এমনিতেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে উদ্ভূত মামলায় অনেক নাম দেওয়া হয়েছে, শত শত নাম ফর নাথিং, আদৌ তারা জড়িত ছিল না। তাদেরকে আমরা রিলিফ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন সবচেয়ে বড় যেটা আপনাদের সমর্থন।
তিনি আরও বলেন, এখন এই পুলিশকে, তাদের মনোবলকে আপনারা সমর্থন দিয়ে উঁচু রাখবেন এবং শক্ত রাখবেন। এখন কোনো অপরাধীকে যদি ধরা হয়, অ্যারেস্ট করা হয়, আর সমাজের লোকজন গিয়ে যদি থানা ঘেরাও করে তাহলে কি আমি ধরে রাখতে পারবো? আপনি যদি মনে করেন আমি অমুকের হত্যার বিচার চাই, রাস্তা বন্ধ করে বসে থাকলেন যে এটা বিচার করতে হবে, না হলে এই শহরের সবাই আজকে চলাচল করতে পারবে না। এইরকম ডিসঅর্ডার যদি রাস্তায় হয়, তাহলে আমি কি ধরে রাখতে পারবো আইনশৃঙ্খলা? আমি পুলিশের প্রাইমেসি প্রতিষ্ঠার জন্য, ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা রাখার জন্য, নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার জন্য যে পরিবেশ তৈরি করতে হবে তার জন্য আপনি তো আমাকে অথরিটি দেবেন। এখন অ্যারেস্ট করলে আপনি ঘেরাও দিয়ে বসে থাকবেন, থানা থেকে যে তাকে ছাড়তে হবে, তাহলে তো আই ডু নট হ্যাভ এনি অথরিটি। আমি আপনাদের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে এটা চাই। যদি অন্যায় করি ধরেন আমাকে। কিন্তু ন্যায় কাজটা আমাকে করতে দেন। এই অনুরোধ আপনাদের কাছে।
এর আগে, পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড অডিটোরিয়ামে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ কল্যাণ সভায় আইজিপি বাহারুল আলম বক্তব্য রাখেন।
আরআই/টিকে