যারা বিপজ্জনক সময়ে কথা বলে, ইতিহাস তাদের মনে রাখে : পানাহিকে চিঠি

নির্বাসিত ইরানি চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহির প্রতি সংহতি জানিয়ে খোলা চিঠি লিখেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকার প্রসুন রহমান। ইরানের বর্তমান উত্তাল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি ফেসবুকে ‘সিনেমা এবং বিবেক: জাফর পানাহির সঙ্গে সংহতি’ শিরোনামে এই চিঠি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, যারা বিপজ্জনক সময়ে কথা বলে, ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রকাশিত ওই চিঠিতে প্রসুন রহমান বলেন, তিনি নিশ্চিত নন চিঠিটি আদৌ জাফর পানাহির কাছে পৌঁছাবে কি না, তবু দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ থেকে সংহতির বার্তা পৌঁছে দিতেই তিনি লিখেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অনেক চলচ্চিত্রকর্মী ইতালীয় নব্যবাস্তববাদের নৈতিক স্বচ্ছতা এবং তার প্রভাবে গড়ে ওঠা ইরানি চলচ্চিত্রের নীরব সাহস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বড় হয়েছেন। তার ভাষায়, এই ধারাগুলো শেখায় কীভাবে শব্দের বাড়াবাড়ি ছাড়াই সত্যকে তুলে ধরা যায়, সাধারণ মানুষের জীবনের ভেতর থেকেই কীভাবে প্রতিরোধ জন্ম নেয় এবং বাস্তবতা কীভাবে ভিন্নমতের ভাষা হয়ে ওঠে।

জাফর পানাহির জীবন ও কর্মজীবনের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে প্রসুন লিখেছেন, তার পথচলা নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সার্বক্ষণিক নজরদারির কোনো বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি ইরানের শিল্পী ও চলচ্চিত্রকারদের দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। তিনি বলেন, মোহাম্মদ রাসুলফ, কেইওয়ান কারিমি থেকে শুরু করে অসংখ্য অভিনেতা, নারী চলচ্চিত্রকার, কবি, সংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী সততা ও সাহসের কারণে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তার মতে, সিনেমা ও শিল্প ক্ষমতার কাছে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল, কারণ সেগুলো এমন বাস্তবতা তুলে ধরেছিল, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না।

চিঠিতে আব্বাস কিয়ারোস্তামি ও ফরুখ ফরুখজাদের নাম উল্লেখ করে প্রসুন বলেন, ইরানি চলচ্চিত্রকাররা এমন এক চলচ্চিত্রভাষা তৈরি করেছেন, যেখানে নীরবতা অনেক সময় স্লোগানের চেয়েও শক্তিশালী। তার মতে, এই মানবিকতাই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভয়।

ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি লেখেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জাফর পানাহি কোনো উসকানিদাতা হিসেবে কথা বলেননি, বরং প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে কথা বলেছেন। প্রসুনের মতে, তিনি ঠিক সেই কাজটিই করছেন, যা প্রকৃত সিনেমা সবসময় করে এসেছে যেখানে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়, সেখানে বাস্তবতার কথাই উচ্চারণ করা।

তিনি আরও বলেন, যেসব দেশে সেন্সরশিপ, ভয় ও আপসের ইতিহাস রয়েছে, সেসব দেশের চলচ্চিত্রকারদের কাছে পানাহির কণ্ঠ গভীরভাবে অনুরণিত হয়। তার ভাষায়, যখন স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, তখনও সিনেমা হারিয়ে যায় না, বরং তা বিবেকের কাজে রূপ নেয়।

পানাহির চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ টেনে প্রসুন লেখেন, তিনি একসময় একটি ছবি বানিয়েছিলেন, যার নামের মধ্যেই ছিল অনুমতি না থাকার ইঙ্গিত, তবু সেটি ছিল চলচ্চিত্রই, কারণ সত্যের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয় না। তার মতে, সেই কাজ মনে করিয়ে দেয় যে ক্যামেরা ডায়েরি হয়ে উঠতে পারে এবং ছবি হয়ে উঠতে পারে প্রমাণ।

কেরালা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পানাহির সর্বশেষ ছবি দেখার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে প্রসুন বলেন, প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরও তার প্রভাব দীর্ঘদিন তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তিনি জানান, পানাহির নতুন ছবি এখনো অনেকেই দেখার অপেক্ষায় আছেন, কিন্তু কবে সেটি দেখা যাবে তা নিশ্চিত নয়, কারণ ইরানি চলচ্চিত্র বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রেক্ষাগৃহে সহজে পৌঁছায় না। তবু দূরত্ব কখনোই তার কাজের শক্তিকে দুর্বল করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

খোলা চিঠির শেষ অংশে প্রসুন তাদের কথাও তুলে ধরেছেন, যারা ক্যারিয়ার বাঁচাতে প্রতিবাদ থেকে বিরত থাকেন। তিনি বলেন, এই চিঠি সেই সব প্রতিষ্ঠানের জন্যও, যারা ইরানি সিনেমাকে উদযাপন করে কিন্তু নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয় না। তার মতে, ইতিহাস স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা মানুষদের নয়, বরং বিপদের সময় কথা বলা মানুষদেরই মনে রাখে।

উল্লেখ্য, প্রসুন রহমান পরিচালিত সর্বশেষ ছবি ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ গত বছর মুক্তি পেয়েছে। তার অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ঢাকা ড্রিম’, ‘সুতপার ঠিকানা’ ও ‘ফেরা’।

এমকে/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
নোয়াখালী-৬ আসনে ১১ দলীয় জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী হান্নান মাসউদ Jan 16, 2026
img
বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলো আফগান পেসার Jan 16, 2026
img
মায়ের শাড়িতে মুগ্ধতা ছড়ালেন তাসনিয়া ফারিণ Jan 16, 2026
img
ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির পথে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক Jan 16, 2026
img
অভ্যুত্থানের পর বক্তব্য-বিবৃতি ছাড়া আমরা কী পেয়েছি? প্রশ্ন তারেক রহমানের Jan 16, 2026
img
ডিসেম্বরের আইসিসির মাসসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হলেন মিচেল স্টার্ক Jan 16, 2026
img
স্টারলিংক ইন্টারনেট কীভাবে ‘অচল’ করে দিচ্ছে ইরান? Jan 16, 2026
img
ঢাকা-১ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেলেন অন্তরা সেলিমা হুদা Jan 16, 2026
img
ইয়েমেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী শায়া মোহসেন জিনদানি Jan 16, 2026
img
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন জীবনধারার ভিডিও ভাগ করার প্রবণতা বেড়েছে: কোয়েল মল্লিক Jan 16, 2026
img
ইসিতে আপিল শুনানির সপ্তম দিন আজ Jan 16, 2026
img
চুয়াডাঙ্গায় ৩টি স্বর্ণের বারসহ পাচারকারী আটক Jan 16, 2026
img
রমজানের আগেই এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিকের আশ্বাস Jan 16, 2026
img
দুর্নীতিমুক্ত কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে : রিজওয়ানা হাসান Jan 16, 2026
img
ঢাকাসহ কোন কোন আসনে নির্বাচন করবে এনসিপি? Jan 16, 2026
img
গাজীপুর-২ আসনের বিএনপি প্রার্থীকে শোকজ Jan 16, 2026
img
ধর্ম নয়, মানবতা আগে: সৌমিতৃষা কুণ্ডু Jan 16, 2026
img
নির্বাচন সামনে রেখে দেশে ফিরছেন সিলেটের প্রবাসীরা Jan 16, 2026
img
বিশ্বে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ঢাকা, বাতাস ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ Jan 16, 2026
img
যারা বিপজ্জনক সময়ে কথা বলে, ইতিহাস তাদের মনে রাখে : পানাহিকে চিঠি Jan 16, 2026