মাদুরোকে অপহরণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগসাজশের ইঙ্গিত

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে মার্কিন অভিযানের কয়েক মাস আগেই দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। অভিযানের পরও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক ব্যক্তি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স আজ এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কাবেলোকে বলেছিলেন- তাঁর অধীনে থাকা নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের ব্যবহার করে যেন বিরোধীদের দমন করা না হয়। গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পরও এই নিরাপত্তা কাঠামো অক্ষত রয়েছে।

উল্লেখ্য, কাবেলোর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় নাম রয়েছে, যে মামলাকে ভিত্তি করেই মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অভিযানের সময় কাবেলোকে আটক করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান মেয়াদের শুরু থেকেই কাবেলোর সঙ্গে এই আলোচনা চলছিল এবং মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঠিক আগের সপ্তাহগুলোতেও যোগাযোগ ছিল। আলোচনায় কাবেলোর বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ফৌজদারি মামলার বিষয়ও উঠে আসে।

এই যোগাযোগকে ভেনেজুয়েলার ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, কাবেলো যদি তাঁর নিয়ন্ত্রিত বাহিনীকে সক্রিয় করেন, তাহলে দেশটিতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজের ক্ষমতা ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কাবেলোর আলোচনায় ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কাবেলো যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা মেনেছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। তিনি অবশ্য প্রকাশ্যে রদ্রিগুয়েজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।

ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলা পরিকল্পনায় রদ্রিগুয়েজ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অনেকের মতে কাবেলোর হাতে রয়েছে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা বা সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা।

সূত্র জানায়, কাবেলো সরাসরি এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। তবে অতি সংবেদনশীল এই আলোচনার বিষয়ে কোনো সূত্রই তাঁদের নাম প্রকাশ করেননি।

এ বিষয়ে জানতে রয়টার্স হোয়াইট হাউস ও ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

৬২ বছর বয়সী দিওসদাদো কাবেলোকে ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং পরে মাদুরোর প্রধান ভরসা হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। বিরোধী দমনের প্রধান কারিগর হিসেবেও তাঁর কুখ্যাতি রয়েছে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা কাবেলোর প্রভাব রয়েছে সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থায়। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করা হয় ‘কোলেক্তিভোস’ নামের সশস্ত্র মোটরসাইকেল বাহিনীকে, যারা প্রায়শই ভেনেজুয়েলার বিক্ষোভ দমনে ব্যবহৃত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, তেলসমৃদ্ধ ওপেক সদস্য এই দেশে একটি রূপান্তরকালীন সময়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাবেলোসহ মাদুরোঘনিষ্ঠ কয়েকজনকেই সাময়িকভাবে ভরসা করা হয়েছে। তবে তাঁর অতীত ভূমিকা ও রদ্রিগুয়েজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলা-বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট আব্রামস বলেছিলেন, ‘যদি ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক রূপান্তর সত্যিই এগোয়, তাহলে একসময় কাবেলোর বিদায় প্রত্যাশিত। যেদিন তিনি সরে যাবেন, সেদিন মানুষ বুঝবে- শাসনব্যবস্থার প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয়েছে।’

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর বিরুদ্ধে ১০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করে এবং তাঁকে ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামের একটি মাদক চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত করে। পরে এই পুরস্কারের অঙ্ক বাড়িয়ে ২৫ মিলিয়ন ডলার করা হয়। কাবেলো অবশ্য বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।

মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতির পর ওয়াশিংটনে প্রশ্ন ওঠে- কেন কাবেলোকে আটক করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য মারিয়া এলভিরা সালাজার তখন মন্তব্য করেছিলেন, ‘দিওসদাদো সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বেশি ভয়ংকর।’

এসকে/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
গ্রিনল্যান্ড না পেলে ইউরোপের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি ট্রাম্পের Jan 18, 2026
img
‘সুদ’ থেকে আয় নিয়ে কী ব্যাখ্যা দিলেন তাহেরি Jan 18, 2026
img
মবের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে : নুর Jan 18, 2026
img
জুলাই শহীদদের নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনা, ‘ইসির কারণে’ বিস্তারিত বললেন না তারেক রহমান Jan 18, 2026
img
ধানুষের সঙ্গে বিয়ের গুঞ্জন ভুয়া, পোস্টে সত্য জানালেন ম্রুণাল! Jan 18, 2026
img
ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচে অধিনায়কের সঙ্গে হাত না মেলানোর ঘটনা ‘অনিচ্ছাকৃত’: বিসিবি Jan 18, 2026
img
একই পোশাকে আলাদা মঞ্চে, আলোচনায় বলিউডের নায়িকারা Jan 18, 2026
img
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মাদারীপুরে রণক্ষেত্র Jan 18, 2026
img
ঘাটালে মেলার উদ্বোধনে একসঙ্গে দেব ও রুক্মিণী, Jan 18, 2026
img
আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় জরিমানা, ম্যাজিস্ট্রেটকে বুড়ো আঙুল দেখালেন রুমিন ফারহানা Jan 18, 2026
img
নীরবে ট্রাম্পের ওপর পাল্টা ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ ভারতের Jan 17, 2026
img
সংকট কাটিয়ে নতুন অধ্যায়, সিনেমায় কণ্ঠ দিচ্ছেন দেবলীনা নন্দী Jan 17, 2026
img
জুলাইয়ে ওড়ানো সেই পতাকা তারেক রহমানকে উপহার দিলেন ছাত্রদলকর্মী Jan 17, 2026
img
আগামীকাল দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে ইসি Jan 17, 2026
img
টানা ১২ দিন ধরে তীব্র শীতে কাঁপছে পঞ্চগড় Jan 17, 2026
img
২২ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ভারতের কাছে বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য হার Jan 17, 2026
img
তারেক রহমানের আসনে ৫৬ সদস্যের মিডিয়া কমিটি ঘোষণা বিএনপির Jan 17, 2026
img
বিক্ষোভে ‘হাজারো হত্যার’ পেছনে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত : খামেনি Jan 17, 2026
img
চট্টগ্রামকে ৩ উইকেটে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে রাজশাহী Jan 17, 2026
ডন ৩ নিয়ে গুজবের ঝড়, অপেক্ষায় দর্শক Jan 17, 2026