প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে তার নতুন উদ্যোগ ‘বোর্ড অব পিস’ প্রদর্শন করবেন এবং একই দিনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এর এক দিন আগে তিনি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে নিজের দেওয়া হুমকি থেকে সরে এসে নিজেকে একজন শান্তির উদ্যোগকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। বুধবার হঠাৎ করেই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি ইউরোপের ওপর আরোপিত শুল্ক বাতিল করছেন এবং ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনাও বাদ দিচ্ছেন।
এতে করে বিশ্বনেতাদের দাভোস বৈঠক ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে।
সুইজারল্যান্ডের এই পাহাড়ি রিসোর্টে অবস্থানের দ্বিতীয় দিনে ট্রাম্প তার বিতর্কিত উদ্যোগ ‘বোর্ড অব পিস’ প্রচারের চেষ্টা করবেন। এ উপলক্ষে সংগঠনটির সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। এই বোর্ডের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বিরোধ ও সংঘাতের সমাধান করা।
নতুন এই বোর্ডে স্থায়ী সদস্য হতে খরচ ধরা হয়েছে ১ বিলিয়ন ডলার।
ট্রাম্প ইতিমধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতাকে এতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বুধবার মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি এখন পর্যন্ত গঠিত সবচেয়ে মহান বোর্ড।’
শুরুতে এই বোর্ডের উদ্দেশ্য ছিল হামাস ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পর গাজা পুনর্গঠন তদারকি করা। তবে বোর্ডের সনদে এর কাজ শুধু গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি।
এ কারণে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ট্রাম্প হয়তো এই বোর্ডকে জাতিসংঘের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ ফ্রান্স ও ব্রিটেন এই উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ সৌদি আরব ও কাতার, এই বোর্ডে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বুধবার সাংবাদিকদের জানান, পাঠানো প্রায় ৫০টি আমন্ত্রণের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জন বিশ্বনেতা এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
এ ছাড়া ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও বোর্ডে যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত ক্রেমলিন জানিয়েছে, তারা আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করছে।
এদিকে নতুন উদ্যোগ ‘বোর্ড অব পিস’-এ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন এ বিষয়ে বেশি চিন্তিত, কারণ দেশটি প্রায় চার বছর ধরে চলা রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধ করতে চায়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, বোর্ড অব পিসের বৈঠকের পর তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনা করবেন। ইউক্রেন যুদ্ধে যুদ্ধবিরতি নিয়ে কঠিন আলোচনা চলার মধ্যেই এই বৈঠক হওয়ার কথা। বুধবার দাভোসে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন যদি শান্তি চুক্তিতে না পৌঁছায়, তাহলে তারা ‘বোকামি’ করবে।
তিনি দাবি করেন, এক বছর আগে দায়িত্ব নেওয়ার সময়ই তিনি বলেছিলেন, চাইলে এক দিনের মধ্যেই এই যুদ্ধের সমাধান করতে পারেন। ট্রাম্প আবারও বলেন, তার বিশ্বাস অনুযায়ী পুতিন ও জেলেনস্কি শান্তি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তবে তিনি এখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি না হওয়ায় কখনো রাশিয়া, আবার কখনো ইউক্রেন-দুই পক্ষকেই দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, তারা এখন এমন এক অবস্থানে আছে, যেখানে একসঙ্গে বসে চুক্তি করা সম্ভব। যদি তারা তা না করে, তাহলে তারা দুজনই বোকা-এই কথা দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।’ ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। তার মতে, এখন ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব ন্যাটো ও ইউরোপের। যদিও ট্রাম্প দাবি করেন, পুতিনের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে, তবু এখন পর্যন্ত সেই সম্পর্ক যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি।
এদিকে ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফ দাভোস থেকে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার সঙ্গে থাকবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
বৃহস্পতিবার তাদের পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়টি থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরিয়ে নিতে পারে।
তবে বুধবার গভীর রাতে ট্রাম্প বলেন, ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি ‘ভবিষ্যৎ চুক্তির একটি কাঠামোতে’ পৌঁছেছেন। এর ফলে তিনি ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর যে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ছিল, তা বাতিল করবেন। দাভোসে এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্ক রুটে বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকটি ‘খুব ভালো’ হয়েছে। তবে তিনি জানান, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে এখনো অনেক কাজ বাকি। ট্রাম্পের দাবি, খনিজসমৃদ্ধ এই আর্কটিক দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড রাশিয়া ও চীনের হুমকির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র : আলঅ্যারাবিয়া।
আরআই/এসএন