বাংলা ছবির পর্দায় কয়েক দশক ধরে যাঁর উপস্থিতি এক অনিবার্য ইতিহাস, তিনি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সময় বদলেছে, বদলেছে নায়িকার মুখ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে গিয়েছে-তবু তাঁর সহযাত্রার তালিকা যেন শেষই হয় না। মুনমুন সেন থেকে রাইমা সেন, একাধিক যুগের অভিনেত্রীদের সঙ্গে একই ফ্রেমে দাঁড়িয়ে তিনি দেখেছেন অভিনয়ের বিবর্তন, শিল্পীর বদলে যাওয়া ভাষা, আর মানুষের ভেতরের অদৃশ্য দ্বন্দ্ব। এত কাছ থেকে দেখার ফলেই তৈরি হয়েছে তাঁর নিজস্ব কিছু অনুভব, কিছু স্বীকারোক্তি-যা কেবল একজন অভিজ্ঞ শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।
ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন পা রাখা অভিনেত্রীদের কাছে প্রসেনজিতের সঙ্গে কাজ করা মানে যেন স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখা। কারও কাছে তিনি আদর্শ, কারও কাছে আবার দূরত্ব রেখে চলার মানুষ। কেউ তাঁকে সমীহ করেন, কেউ বা অকারণ ভয় পান। অথচ এই বহুরূপী ইমেজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর সত্য-একজন অভিনেত্রী আছেন, যাঁর সামনে দাঁড়াতে গিয়ে স্বয়ং বুম্বাদার মধ্যেও চলে এক অস্বস্তি।
সম্প্রতি এক কথোপকথনে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, সুদীপ্তা চক্রবর্তীর সঙ্গে অভিনয় করতে গেলেই তাঁর ভেতরে কাজ করে এক অদ্ভুত ভয়। সেই ভয় দুর্বলতার নয়, বরং প্রতিভার সামনে দাঁড়ানোর। তাঁর কথায়, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এমন অভিনয়শক্তি খুব কমই দেখা যায়। শুধু ভয় নয়, সেখানে ঈর্ষার ছায়াও আছে-কারণ এমন নিখুঁত অভিনয় সকলের ভাগ্যে জোটে না।
আলোচনার স্রোত ঘুরে যায় রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। প্রসেনজিতের চোখে রচনা মানে নিখাদ পেশাদারিত্ব। কাজের জায়গায় তাঁর সততা, নিয়মানুবর্তিতা আর দায়িত্ববোধ তিনি বারবার প্রত্যক্ষ করেছেন-এক ছবিতে নয়, বহুবার। একসঙ্গে একাধিক কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই এই মূল্যায়ন, যা প্রশংসার চেয়েও বেশি বিশ্বাসযোগ্য।
ওপার বাংলার জয়া আহসানকেও তিনি দেখেন একেবারে তৈরি শিল্পী হিসেবে। অভিনয়ে তাঁর প্রস্তুতি, পরিমিতিবোধ আর গভীরতা প্রসেনজিতের চোখ এড়ায়নি। রাইমার প্রসঙ্গে তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়ে অন্য এক রং-কখনও শাসন, কখনও আবেগ। বকা খেয়ে চোখে জল এলেও, অভিনয়ের দক্ষতায় যে রাইমা অনন্য, সে কথা তিনি স্পষ্ট করেই জানান।
স্ত্রী অর্পিতার প্রসঙ্গেও অকপট ছিলেন তিনি। স্ত্রী হিসেবে নয়, অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর মূল্যায়নেও প্রসেনজিৎ সোজাসাপ্টা। খুব বেশি প্রস্তুতি নিয়ে সেটে আসেন না-এ কথা স্বীকার করলেও, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েই যে ম্যাজিকটা তৈরি হয়, সেটাকেই তিনি অর্পিতার আসল শক্তি বলে মানেন।
আর শেষে আসে পাওলি দামের কথা-একটু আক্ষেপ, একটু প্রশ্ন নিয়ে। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে কমেডিতে আরও বেশি ব্যবহার করা হয় না, তা নিয়ে বিস্মিত হন প্রসেনজিৎ। তাঁর চোখে পাওলি শুধু শক্তিশালী অভিনেত্রী নন, তার মধ্যে রয়েছে কমেডি চরিত্রে অভিনয় করার সমান দক্ষতা-যা বারবার প্রমাণিত, তবু যেন এখনও পুরোপুরি আবিষ্কৃত নয়।
এইভাবেই সহঅভিনেত্রীদের গল্প বলতে গিয়ে আসলে নিজেরই আরেকটি দিক খুলে দেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। কিংবদন্তি হয়েও তিনি জানেন-প্রতিভার সামনে মাথা নত করতে হয়, ভয় পেতে হয়, ঈর্ষা করতে হয়।
কেএন/টিকে